প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:১৭ পিএম
ন্যায্য পাওনা ফেরত নিতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘোরা, ফাইল আটকে থাকা এবং নানা অদৃশ্য জটিলতা- সব মিলিয়ে ভ্যাট রিফান্ড ছিল কর ব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল একটি জায়গা। সেই চিত্র বদলাতে নতুন উদ্যোগ নিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে ভ্যাট রিফান্ডের আবেদন ও অর্থ পরিশোধ দুটোই হবে অনলাইনে, সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে।
এ লক্ষ্যে ই-ভ্যাট রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করেছে এনবিআর। নতুন এই ব্যবস্থায় করদাতারা কোনো ভুল সংশোধন বা অতিরিক্ত পরিশোধিত ভ্যাট ফেরত পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) ঢাকার আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে এই অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকার তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি ৪৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ভ্যাট রিফান্ড পাঠানো হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, করদাতা এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘ভ্যাট রিফান্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সময়ক্ষেপণ ও ভোগান্তি। নতুন ব্যবস্থায় করদাতাদের আর আবেদন জমা দিতে কিংবা টাকা নিতে ভ্যাট কার্যালয়ে যেতে হবে না। এতে একদিকে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘করদাতারা অনেক সময় ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সরকারকে কর পরিশোধ করেন। সেই টাকা ফেরত পেতে যদি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় কিংবা নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সেটি কর প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক। রিফান্ড করদাতার অধিকার, সেটি সহজভাবে ও দ্রুত ফেরত দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
এনবিআর জানায়, নতুন ব্যবস্থার আওতায় ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ই-ভ্যাট সিস্টেমে একটি আলাদা রিফান্ড মডিউল যুক্ত করা হয়েছে। এই মডিউলটি অর্থ বিভাগের আইবাস সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে রিফান্ড অনুমোদন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি করদাতার নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, করদাতা নিজেই ই-ভ্যাট সিস্টেমে তার ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করবেন, যা ভবিষ্যতের জন্য এনবিআরের ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। করদাতাকে শুধু অনলাইনে রিফান্ড আবেদন সাবমিট করতে হবে। এরপর যাচাই-বাছাইসহ বাকি সব কার্যক্রম এনবিআর নিজ উদ্যোগে সম্পন্ন করবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত ১১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১২৪ কোটি টাকা ভ্যাট রিফান্ড চেয়ে আবেদন করেছে। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট রিফান্ড দেওয়ার দায় রয়েছে এনবিআরের। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা রিফান্ড দাবিগুলো নিষ্পত্তির পথ সহজ হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে ভ্যাট রিফান্ড পাওয়া আম্বার গ্রুপের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মো. ইমরান হোসেন বলেন, এটি সত্যিই একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ভ্যাট রিফান্ড একটি বড় ইস্যু। এতদিন এই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল। নতুন ব্যবস্থায় পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও সহজ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, আজ যে পদ্ধতির উদ্বোধন হলো, তাতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত ও ঝামেলামুক্তভাবে রিফান্ড পাবেন। এতে ব্যবসার তারল্য বাড়বে এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি ভবিষ্যতে এনবিআরের কাছ থেকে আরও শিল্পবান্ধব ও করবান্ধব পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ভ্যাট রিফান্ড সাধারণত তখনই তৈরি হয়, যখন আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত কর প্রকৃত ভ্যাট দায়ের চেয়ে বেশি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কারও ভ্যাট দায় যদি ৩০ টাকা হয় কিন্তু তিনি ৫০ টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে অতিরিক্ত ২০ টাকা তার রিফান্ডযোগ্য। একই সেবা বা পণ্যের ক্ষেত্রে একাধিকবার ভ্যাট কর্তন হলে কিংবা ভ্যাট মওকুফ থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী শিল্পে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বা অগ্রিম কর পরিশোধ করা হলে সেখানেও রিফান্ডের দাবি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবসায়ীদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগও শোনা যায়। অনলাইন রিফান্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে এই অনিয়ম কমবে এবং করদাতাদের আস্থা বাড়বে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, এতদিন ভ্যাট রিফান্ডের আবেদন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ছয় মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত। পুরোপুরি অনলাইনে পদ্ধতি কার্যকর হলে তিন থেকে দশ কার্যদিবসের মধ্যে রিফান্ড পাওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্ধারিত নিয়ম, কাগজপত্র ও তথ্য সঠিকভাবে দাখিল করা বাধ্যতামূলক হবে বলে জানিয়েছেন তারা।