প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০৪ পিএম
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ২৫৭ কোটি ডলারের নতুন সার্বভৌম অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৪ সালে সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য ১১৮ কোটি ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ প্রতিশ্রুতির এই বড় উল্লম্ফন এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের চাপ মোকাবিলা করছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বহুপাক্ষিক ঋণের মাধ্যমে সামাল দেওয়ার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এডিবির ২০২৫ সালের দেশভিত্তিক কর্মসূচি অনুযায়ী, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার, নগর পরিষেবা সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে সহায়তা এবং কক্সবাজার অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও মৌলিক পরিষেবা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে অর্থায়নের পোর্টফোলিও সাজানো হয়েছে, যাতে অবকাঠামো বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা যায়।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে, যেখানে উন্নয়ন বিনিয়োগের পাশাপাশি নীতিগত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং উন্নয়ন সহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে এডিবি তার প্রতিশ্রুতি জোরদার করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালে ঘোষিত ২৫৭ কোটি ডলারের সার্বভৌম অর্থায়নের মধ্যে অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার খাত সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে। মোট প্রতিশ্রুতির প্রায় ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিবহন অবকাঠামো খাতে। এ খাতে সড়ক, রেল এবং আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়নের প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। আর্থিক খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩ শতাংশ, যেখানে ব্যাংকিং খাত সংস্কার, আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারি খাত ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন খাতে ১৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মূলত নীতিগত সংস্কার, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের দিকে লক্ষ রেখে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জ্বালানি খাতে ১১ শতাংশ, পানি ও নগর উন্নয়নে ৯ শতাংশ এবং মানব ও সামাজিক উন্নয়নে ৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতভিত্তিক বণ্টন এডিবির প্রচলিত অবকাঠামোকেন্দ্রিক ঋণনীতির ধারাবাহিকতাই তুলে ধরে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্কার ও নীতিগত সহায়তার অংশ কিছুটা বেড়েছে।
২০২৫ সালের প্রতিশ্রুতির অন্যতম বড় প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলওয়ে উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে এবং ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগে একটি বিকল্প বাইপাস সংযোগ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটন প্রবাহে সহায়ক হতে পারে।
ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য ঘোষিত ৫০ কোটি ডলারের ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীলকরণ ও সংস্কার কর্মসূচির প্রথম উপ-কর্মসূচিও ২০২৫ সালের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতির অংশ। এ কর্মসূচির আওতায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের করপোরেট সুশাসন উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংকিং খাত যে চাপে রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে এডিবি।
পাশাপাশি ৪০ কোটি ডলারের জলবায়ু-সহনশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচির দ্বিতীয় উপ-কর্মসূচির মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে নির্গমন হ্রাস এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি জোরদারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অভিযোজন ও সহনশীলতা বাড়াতে এই ধরনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়ন দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন নীতি বিশ্লেষকরা।
এডিবির দাবি অনুযায়ী, উন্নত প্রকল্প প্রস্তুতি, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কারের ফলে ২০২৫ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নে তুলনামূলক গতি এসেছে। একই সঙ্গে সার্বভৌম নয় এমন অর্থায়নের মাধ্যমে বস্ত্র খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বাণিজ্য অর্থায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, ক্ষুদ্রঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগে সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ৭২ কোটি ডলারের সহ-অর্থায়ন সংগ্রহে সহায়তা করেছে এডিবি। এর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং নীতিগত সংস্কারে সহায়তার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পরামর্শমূলক ও কারিগরি সহায়তা কার্যক্রমও চালু রাখা হয়েছে।
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সংস্থাটির মোট ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে এডিবির ৪৮টি চলমান প্রকল্প রয়েছে, যার সম্মিলিত মূল্য প্রায় ১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এসব প্রকল্পের বড় অংশই পরিবহন, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে এডিবি জানিয়েছে, অর্থনৈতিক করিডর উন্নয়ন, বহুমাত্রিক লজিস্টিকস জোরদার, সরকারি ও পুঁজিবাজার সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করাই হবে তাদের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনার মূল দিকনির্দেশনা।