আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৪৮ পিএম
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) সরকারের ব্যয় সংকোচনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে। এসব খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দ কমানো হয়েছে। মূল এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দুই লাখ কোটি টাকা করা হতে পারে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন কমছে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন কমছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার এনইসি সম্মেলন কক্ষে কমিশনের বর্ধিত সভায় সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এক সপ্তাহ পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে আরএডিপি অনুমোদন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির প্রভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতের অধিকাংশ চলমান ও পরিকল্পিত প্রকল্পে বড় ধরনের বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে।
শিক্ষার বরাদ্দ কমছে ৩৪ শতাংশ
শিক্ষা খাতে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এই কাটছাঁটের পরিমাণ ৯ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। ফলে শিক্ষা খাতে চূড়ান্ত বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১৮ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা, যেখানে মূল এডিপিতে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া প্রস্তাবনায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে। এই বিভাগের ব্যয় কমানো হয়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। বরাদ্দ কমেছে ৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। সংশোধনের পর বিভাগের মোট আকার দাঁড়াচ্ছে ৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা, যা মূল এডিপিতে ছিল ১১ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৬ শতাংশের বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ প্রকল্পেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কাটা পড়েছে। এসব প্রকল্পে বরাদ্দ হ্রাসের ফলে শিক্ষা অবকাঠামো ও মানোন্নয়নের কার্যক্রমে গতি কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে শিক্ষা খাতের সব অংশে বরাদ্দ কমেনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত দুই হাজার ২৫১ কোটি টাকা যোগ করা হয়েছে। এর ফলে মোট বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা মূল এডিপির তুলনায় ৩৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। একইভাবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ সামান্য বাড়ানো হয়েছে। এই বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৩ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ১ দশমিক ৭০।
স্বাস্থ্য খাতে গভীর কাটছাঁটের চিত্র
স্বাস্থ্য খাতে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে গভীর কাটছাঁটের চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত ও চলমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে বড় অঙ্কের বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে চারটি ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে দুই হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের প্রায় ৮৮ শতাংশ। সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে ৯৪ শতাংশ। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে কাটা পড়েছে ৮৫ শতাংশের বেশি অর্থ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মুগদা মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণসহ আরও কয়েকটি স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রকল্পে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো সম্প্রসারণ কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংকোচন হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা
সামাজিক সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও ব্যয় সংকোচনের প্রভাব পড়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। নগর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রতিরোধমূলক সেবা প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ ৮০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ঢাকা স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৪১ শতাংশের বেশি। ইমপ্রুভিং আরবান গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট থেকে কাটা পড়েছে প্রায় ৭১০ কোটি টাকা।
ছাড় পায়নি যোগাযোগ খাতও
যোগাযোগ খাতে সংশোধিত এডিপিতে বড় প্রকল্পগুলোর বরাদ্দে ব্যাপক কাটছাঁট করা হয়েছে। নগর যোগাযোগ, সড়ক, রেল, বন্দর ও বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ হ্রাসের ফলে অবকাঠামো সম্প্রসারণ পরিকল্পনা চাপে পড়েছে। সড়ক খাতে হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে এক হাজার ৫৬২ কোটি টাকা করা হয়েছে। ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক প্রকল্পেও বরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ এলিভেটেড সড়ক প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে ৯৫ শতাংশের বেশি। মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কের ওপর মেঘনা-ধনাগোদা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় ৯৭ শতাংশ কমানো হয়েছে।
রেল খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে কাটা পড়েছে ৯১০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটার গেজ রেললাইনকে ব্রড গেজে রূপান্তর প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্দর ও বিমানবন্দর খাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ চার হাজার ৬৮ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার ৮৫ কোটি টাকায় নামানো হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ৩০৬ কোটি টাকায়। বিআরটি প্রকল্পে বরাদ্দ ১৬৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ৩৬ শতাংশ
সংশোধিত এডিপিতে একযোগে আটটি মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের প্রায় ৩৬ শতাংশ। নগর পরিবহন খাতে এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে এক হাজার ২৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে বরাদ্দ আট হাজার ৬৩১ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০১ কোটি টাকায়। এমআরটি লাইন-৫ উত্তর অংশের বরাদ্দ এক হাজার ৪৯০ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৯২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখে ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়ক প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়িয়ে চার হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা করা হয়েছে।