প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:৫৫ পিএম
জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিলের (এনএইচআরডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ ঘিরে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এসে সিলেকশন কমিটির প্রস্তুতকৃত রেজাল্ট সিট বাদ দিয়ে আরেকটি ‘বিকল্প সিট’ উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে। এতে সুষ্ঠু নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান এনএইচআরডিএফের এমডি পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তাতে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৬০ বছর। প্রথম দফায় মাত্র চারজন আবেদন করায় কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট না হয়ে বয়সসীমা বাড়িয়ে ৭০ বছর নির্ধারণ করে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি দেয়। দুই বিজ্ঞপ্তি মিলিয়ে মোট আবেদন জমা পড়ে ১৬টি। বাছাই শেষে ৬ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে গঠিত বাছাই কমিটি ২৭ নভেম্বর ছয় প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেয়। পরীক্ষার পর একটি রেজাল্ট সিট তৈরি করা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে গত ৩০ নভেম্বর অর্থ সচিব খাইরুজ্জামান মজুমদারকে সভাপতি করে বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মোট ৯ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় বাছাই কমিটির রেজাল্ট সিট উপস্থাপন করা হলে একজন প্রভাবশালী সদস্য সেই তালিকা থেকে তৃতীয়স্থানকারী প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন। তখন অন্য সদস্যরা প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে কারা আছেন তা জানতে চান। বোর্ড সভাপতি তখন সিলেকশন কমিটির আসল রেজাল্ট সিট দেখানোর পরিবর্তে একটি প্রস্তুতকৃত ‘বিকল্প রেজাল্ট সিট’ উপস্থাপন করেন। এই বিকল্প সিটে বিসিএস ৭ম ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ভুতাপেক্ষ পদোন্নতিপ্রাপ্ত সচিব) তৌহিদুর রহমানকে এমডি পদে নিয়োগের প্রস্তাব করেন।
সূত্র বলছে, সভায় উপস্থিত একাধিক সদস্য অন্য প্রার্থীদের রেজাল্ট সিট দেখতে চাইলেও তা দেখানো হয়নি। বরং তৌহিদুর রহমানকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনীত প্রার্থী বলে জানানো হয়। এমন প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেননি।
সূত্রে জানা গেছে, এই তৌহিদুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। গত বছরের জুলাই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা ছিল না বলে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন। তার এই নিয়োগ নিয়ে বিএনপিপন্থী আমলাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো এ প্রশ্ন গোটা প্রশাসনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিএনপিপন্থী তরুণ ও প্রবীণ- দুই পক্ষই প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে ত্যাগী, অভিজ্ঞ এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছেন, সেখানে হঠাৎ একজন বিতর্কিত অতীতধারী কর্মকর্তাকে প্রার্থী তালিকায় আনা কতটা যুক্তিযুক্ত।
তারা মন্তব্য করেন, যদি অতীতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা হয়, তাহলে তৌহিদুর রহমানের বিষয়ে আরও অনেক তথ্য সামনে আসবে, যা তার যোগ্যতার প্রশ্নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রগুলো জানায়, এনএইচআরডি পদে নিয়োগের জন্য বাছাই করা কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমল ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালকের দাযিত্বে ছিলেন। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সচিব নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তিনি বেনামী এক পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘কল্পিত দুর্নীতি’ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বেনামী পত্রকে ভিত্তি করে পাঁচটি মন্ত্রণালয়ে অনুসন্ধানের চিঠি পাঠানো হয়। আর ওই চিঠি ইস্যু করেন তৎকালীন পরিচালক তৌহিদুর রহমান। পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে জানা যায়, এই বেনামী পত্রের বিষয়টি ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত একটি উদ্যোগ- যা তৎকালীন একটি রাজনৈতিক শিবিরের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগও ছিল। এ ঘটনার পর সচিব নূরুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর তৌহিদুর রহমানের চাকরির বয়স তখন ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এক এগারোর সময় বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যখন নিয়োগ-দায়িত্বে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমডি নিয়োগে রেজাল্ট সিট বদলে ‘মনগড়া তালিকা’ উপস্থাপনের অভিযোগ জনমনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তবে এ ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কি না- তা জানা যায়নি। তবে প্রশাসন ও উন্নয়ন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বাছাই কমিটির মূল্যায়ন বাদ দিয়ে ইচ্ছেমতো তালিকা বদলে ফেলা হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
জানা গেছে, এমডি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন অস্বচ্ছতা দেশের প্রশাসনিক শুদ্ধাচার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রত্যাশকারী অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ‘যদি অন্তর্বর্তী সরকার আমলেও যোগ্যতার তালিকা উল্টে নিজের মতো রেজাল্ট তৈরি করে কাউকে বসানোর চেষ্টা হয়, তাহলে প্রার্থীরা কোথায় যাবে? ঘটনার বিষয়ে অর্থ বিভাগ বা বোর্ডের কোনো সদস্য মন্তব্য করতে চাননি। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি, যাতে প্রকৃত সত্য প্রকাশ পায় এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে।