প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:৩৬ পিএম
রাজধানীর পানির অপচয় রোধে স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের মতো পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপচয় কমানো, ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ বিলিং নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এই পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট নামে এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের নন-রেভিনিউ ওয়াটার বা অপচয় হওয়া পানির হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পে দিচ্ছে ২০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অনুদান। পুরো প্রকল্পের ব্যয় হবে ২২ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রস্তাব পাঠানোর পর পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বৈঠকে বসে এবং কিছু সংশোধনীসহ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। সংশোধনীর মধ্যে আছে টিএপিপি পুনর্গঠন, দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণের বিস্তারিত যুক্ত করা, প্রকল্পের কার্যপরিধি সুস্পষ্ট করা এবং সময়সীমা এক বছর কমানো। এলজিডি প্রথমে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় চাইলেও কমিশন বলেছে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে।
ওয়াসার হিসাব বলছে, ঢাকায় পানি অপচয়ের হার ৩০ থেকে ৪২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। এ অপচয়ের বড় অংশই লিকেজ, অননুমোদিত সংযোগ, পুরনো পাইপলাইন এবং মিটারবিহীন ব্যবহার থেকে আসে। স্মার্ট মিটার স্থাপন হলে প্রতিটি পরিবারের পানি ব্যবহারের হিসাব রিয়েল-টাইমে পাওয়া যাবে এবং সিস্টেমে কোথায় পানি হারিয়ে যাচ্ছেÑ তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
টিএপিপি অনুসারে, প্রকল্পে দুই হাজারের বেশি স্মার্ট মিটার বসানো হবে। এই মিটারগুলো যোগাযোগ ডিভাইসের মাধ্যমে পানি ব্যবহারের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠাবে, ফলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। ব্যবহারকারীরাও স্মার্টফোন বা ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবহারের হিসাব দেখতে পারবেন। ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভ্যালভ অপারেটরদের হাতে-কলমে মিটার রিডিং নেওয়ার প্রথা নানা অনিয়ম ও ত্রুটির জন্ম দিয়েছে। স্মার্ট মিটারিং এই কাঠামোকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করবে।
প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ থাকবে সমীক্ষা, স্টাডি এবং প্রশিক্ষণে। সমীক্ষা ও প্রযুক্তিগত স্টাডির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ কোটি টাকার বেশি এবং পরামর্শক সেবার জন্য আছে আড়াই কোটি টাকার কাছাকাছি। দেশি ও বিদেশি প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক, যা নিয়েও কমিশন বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে। কী ধরনের প্রশিক্ষণ হবে, কতদিন চলবে, কারা অংশ নেবে, কোন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ হবে-এসব তথ্য টিএপিপিতে যুক্ত করতে বলা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন মনে করছে, প্রযুক্তি-নির্ভর এই প্রকল্প টেকসই করতে হলে প্রশিক্ষণ অংশটিকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।
ঢাকা ওয়াসার ২০১৪ সালের ওয়াটার সাপ্লাই মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী শহরকে ১৪৫টি জোনে ভাগ করা হয় এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ৮০টি ডিস্ট্রিক্ট মিটারিং এরিয়া গঠন করা হয়। এসব ডিএমএতে মিটার স্থাপন ও অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফলে অপচয় হওয়া পানির হার কমতে শুরু করে। পরে ওয়াসা এসসিএডা সিস্টেম চালু করে, যা পানি উৎপাদন, বিতরণ এবং চাপ নিয়ন্ত্রণের তথ্য সরবরাহ করে। তবে এসসিএড শুধু ম্যাক্রো ডেটা দেয়, প্রতিটি পরিবারের ব্যবহারের তথ্য দেয় না। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সালাম ব্যাপারী বলেছেন, এই ঘাটতি পূরণে স্মার্ট মিটারিং অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এবং কোরিয়ার প্রযুক্তি সহযোগিতা সে পথে বড় সহায়তা দেবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওয়াসার অপারেশনাল সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও সহজ হবে।
এ প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো পানি ব্যবহারের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা। ওয়াসার কর্মকর্তাদের মতে, ঢাকায় পানি তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় অনেক পরিবারই পানি ব্যবহারে সচেতন নয় এবং অপচয় হয় প্রচুর। স্মার্ট মিটার ব্যবহারের মাধ্যমে কোন পরিবার কত পানি ব্যবহার করছে তার নির্ভুল হিসাব দেখা যাবে, ব্যবহার বেশি হলে বাড়িকে সতর্কবার্তা পাঠানো যাবে এবং লিকেজ ধরা যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। অফিসঘরে না গিয়েও ওয়াসা বুঝতে পারবে কোন লাইনে চাপ কমেছে বা কোথাও পাইপলাইন ফেটে পানি নষ্ট হচ্ছে।
নগরীর জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ওয়াসাকে এখন পৃষ্ঠস্রোত নির্ভর জলশোধন প্রকল্পে যেতে হচ্ছে, যার ব্যয় অনেক বেশি। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি লিটার পানি রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থা মাঠে সফল হলে রাজধানীর পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগ শুরু হবে। ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অপচয় শনাক্তকরণ এবং সাশ্রয়-সব মিলিয়ে এটি ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট পানি নেটওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি করবে।