প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৪৮ পিএম
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, বৈদেশিক ঋণ-অনুদানের কম গ্রাহ্যতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কঠোর শর্তপালনে জটিলতার কারণে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়েছে। সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে কমিয়ে ২ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা কমছে ১৪ হাজার কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে প্রেরিত নির্দেশনায় জানানো হয়, এবার সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণে মূল প্রভাব ফেলেছে বৈদেশিক সহায়তার উল্লেখযোগ্য হ্রাস। মূল এডিপিতে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর আদায় সক্ষমতা এবং ব্যয় অগ্রগতির ধীরগতির কারণে এই বরাদ্দ ১৪ হাজার কোটি কমিয়ে ৭২ হাজার কোটিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প সহায়তা পৌঁছতে বিলম্ব, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ, পরিবেশগত ও সামাজিক নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণে জটিলতা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদহার বৃদ্ধিÑ এসব কারণে ব্যয় সংকোচন করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্দেশনা অনুযায়ী, দ্রুত চূড়ান্ত সংশোধিত এডিপি প্রণয়ন করে অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনকে জানানো হয়েছে যে, যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগে বিদেশি অর্থায়নযুক্ত প্রকল্পগুলোর ব্যয় অগ্রগতি সবচেয়ে কম, তাদের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকেও বরাদ্দ কমানো হবে। এ ছাড়া যেসব প্রকল্প কম গুরুত্বপূর্ণ বা অগ্রগতি নেই, সেগুলোর বরাদ্দ প্রত্যাহার করে উচ্চ অগ্রাধিকারসম্পন্ন প্রকল্পগুলোতে পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষত এমন সব প্রকল্প, যেগুলো সমাপ্তির কাছাকাছি বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তাদের বরাদ্দ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন গত ২-৫ নভেম্বর বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ নির্ধারণে একাধিক পর্যালোচনা সভা করে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প অগ্রগতি, অর্থছাড়া, মাঠপর্যায়ের কাজের সময়সূচি, উন্নয়ন সহযোগীদের ছাড়পত্র অনুমোদনের অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ব্যয়সক্ষমতা বিশদভাবে যাচাই করা হয়। কমিশনের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, অনেক প্রকল্পে ব্যয় অগ্রগতি ছয় থেকে ৯ মাস ধরে স্থবির ছিল। বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সংকট, বিশেষত পরিবেশ-সামাজিক মানদণ্ড অনুসরণে জটিলতা, প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, দরপত্র বাতিল বা পুনরায় আহ্বানÑ এসব সমস্যা ব্যয়ের গতি কমিয়েছে। ফলে আরএডিপি সংকোচন প্রায় অনিবার্য ছিল।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আইএমইডির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য বলছে এর আগে কখনও এত কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।
এডিপির মূল কাঠামো অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল ৫৮ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। মেট্রোরেলের নতুন লাইন, রেলপথ সম্প্রসারণ, সড়ক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণÑ এসব বড় প্রকল্পে ব্যয় অগ্রগতি ধীর হলেও বরাদ্দ কমানো হয়নি, কারণ এগুলো সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। তবে এখানেও কিছু প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে বিদেশি সহায়তার অংশ যথাসময়ে ছাড় হয়নি। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা এবং এর একটি বড় অংশ বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব এসেছে। গৃহায়ন খাতে ২২ হাজার ৭৭৬ কোটি ও স্বাস্থ্য খাতে ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের একাধিক প্রকল্পে বিদেশি সহায়তার ব্যয় অগ্রগতি অত্যন্ত কম।
সম্প্রতি একনেক ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গত অর্থবছরে নানা জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আশানুরূপ হয়নি। তার মতে, নির্বাচনের আগে সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত হলে পরবর্তী বছরের প্রকল্প ব্যয়ে গতি বাড়বে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবও কমবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেশকিছু মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প পরিচালকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ধীরতার কারণে অর্থ খরচ আটকে থাকে। উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পে ব্যয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সরকারের নিজস্ব ব্যয়ভারও নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে। ঋণ-অনুদান পাওয়া কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে, যা আমদানি ব্যয় এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব ফেলে। ফলে জিওবি তহবিল খরচেও সতর্কতা চাই। আরএডিপি চূড়ান্ত করার আগেই মন্ত্রণালয়গুলোকে অব্যবহৃত বরাদ্দ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, যাতে মোট বরাদ্দ কাঠামো বাস্তবসম্মত হয়।
এবারই প্রথম ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণত আরএডিপি অনুমোদন মার্চ বা এপ্রিল মাসে হতো, ফলে প্রকল্প ব্যয় শুরু হতো অর্থবছরের শেষদিকে। এতে বছরের প্রাথমিক ছয় মাস প্রায় অকার্যকর থেকে যেত। তাই এবার আগেভাগে আরএডিপি চূড়ান্ত করলে প্রকল্প ব্যয়প্রবাহ পুরো অর্থবছরে সমান থাকবে বলে আশা করছেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা।