প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:১৫ পিএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১৯:৩৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চলতি বছরের অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে সরকারি প্রকল্পগুলোতে। অক্টোবরে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে থাকলেও নভেম্বরে তা কিছুটা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) প্রথম পাঁচ মাস জুলাই-নভেম্বরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই থেকে নভেম্বরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৭ হাজার ১২২ কোটি টাকার। চলতি বছর এডিপিতে বরাদ্দ ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়ন ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। গত অর্থবছরের (২০২১-২২) একই সময় তা ছিল ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এ ছাড়া একক মাস হিসেবে শুধু নভেম্বরে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ করেছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চলতি মাসে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এর আগের বছরের নভেম্বরে বাস্তবায়ন ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ একক মাস হিসেবে গত বছরের তুলনায় বাস্তবায়ন বেড়েছে।
এডিপির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অর্থ খরচ করেছে ২৭ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। বিদেশি অর্থ খরচ করেছে ১৭ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া বাকি অর্থ খরচ হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে; যা ১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং এটি মোট বরাদ্দের ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
চলতি বছর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মোট প্রকল্প সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে মূল প্রকল্প ১ হাজার ৪৪১টি, উপপ্রকল্প ৪৬টি এবং উন্নয়ন সহায়তা থোক ৯টি। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৬টি, আর বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ২৯৬টি।
এদিকে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকেই একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসে ব্যয় সাশ্রয়ের প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করা হয়েছে সাতটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সর্বশেষ পরিপত্র জারি করেছে গত মঙ্গলবার। অর্থ বিভাগ এ দফায় বলেছে, চলতি অর্থবছরে পরিচালন বাজেটের অধীন ভূমি অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। আর আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন এবং অন্যান্য ভবন খাতে নতুন কোনো কার্যাদেশ দেওয়া যাবে না। তবে ইতোমধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এমন ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় করা যাবে না।
শুধু তা-ই নয়, পরিচালন বাজেটের অধীন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক, আসবাব ইত্যাদি খাতে অর্থ ব্যয়ও সম্পূর্ণভাবে স্থগিত থাকবে। বাজেটে এসব খাতে যে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে, সেগুলো অন্য কোনো খাতে খরচ করা যাবে না, আবার অন্য খাত থেকেও এসব খাতে অর্থ আনা যাবে না।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য।
আগের পদক্ষেপগুলো ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানো; সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত; সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো; বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের সম্মানী বাতিল ও নতুন গাড়ি কেনা বন্ধ ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপে ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করছে অর্থ বিভাগ।
অর্থ বিভাগের কর্মচারীরা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত, প্রতিষ্ঠানে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো, সম্মানী বাতিল ও নতুন গাড়ি কেনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোনো ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছিল না সরকারের। তাই চলতি অর্থবছরের সাড়ে ছয় মাস বাকি থাকতেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
গত জুলাই থেকে সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দও কাটছাঁটের পথে হাঁটছে। কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’-এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়, চলতি অর্থবছরে কিছু প্রকল্পে কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। আবার কিছু প্রকল্পে অর্থ দেওয়া হবে ২৫ শতাংশ কম। এতে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের পরিপত্র ভালোভাবে কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় সাশ্রয় হবে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা। গত সাড়ে পাঁচ মাসে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো কার্যকর হলে ব্যয়সাশ্রয়ের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বা উন্নয়ন বাজেটের আকার ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যয়সাশ্রয়ের পদক্ষেপের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যয়সাশ্রয়ের পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য। তবে ঢালাওভাবে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করাটা ঠিক হলো না। এডিপি ভালোভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে জমি অধিগ্রহণের দেরিকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই অধিগ্রহণই যদি দেরিতে হয়, তাহলে তো একদিকে খরচ বাড়বে, অন্যদিকে সময় বেশি লাগবে।