প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৫৫ পিএম
ঋণ নির্ভর উন্নয়নের চাপ এখন দৃশ্যমানভাবে পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণ এসেছে যতটুকু, তার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। এতে প্রকল্পের রিটার্ন না আসায় নতুন ঋণ দিয়েই পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বাড়ছে। বাধ্য হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেও ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, অথচ একই সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রাপ্তির চেয়ে প্রায় ১৩ কোটি ডলার বেশি গেছে ঋণ পরিশোধে। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করতে হয়েছিল ১১২ কোটি ডলার। সে তুলনায় এবারের পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, যার মধ্যে শুধু আসল পরিশোধই বেড়েছে ১৩ কোটি ডলার।
ইআরডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে পদ্মা রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, কর্নফুলী টানেলসহ বেশ কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলো থেকে এখনো প্রত্যাশিত আয় আসছে না। টানেল ও রেল প্রকল্প থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ই পুরোপুরি মেটানো যাচ্ছে না। ফলে এসব প্রকল্পের ঋণ সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিদায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইতিহাসে রেকর্ড ৪০৯ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ কোটি ডলার বেশি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৩৩৫ কোটি ডলার এবং ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২৬৭ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান সুদের হার ও বাজারভিত্তিক ঋণের কারণে পরিশোধে এই চাপ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এই পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৯১ কোটি ৬ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। তবে প্রতিশ্রুতি বাড়লেও বাস্তবে ছাড়ের গতি কমে গেছে, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বাজারভিত্তিক ঋণের সুদও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট (এসওএফআর) বেড়ে ৫ শতাংশের বেশি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের আগে এটি ১ শতাংশের নিচে ছিল। ফলে বাংলাদেশের জন্যও বাজারভিত্তিক ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, বিশেষত জাইকা, এডিবি বা বাণিজ্যিক ঋণপথে নেওয়া অর্থের ক্ষেত্রে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “আমাদের বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে পরিশোধের চাপও। আগামী দুই–তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদি রাজস্ব আদায় বাড়ানো না যায় এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বৃদ্ধি না পায়, তাহলে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতিতে দুর্দশা তৈরি করবে। তাই প্রতিটি ঋণের ব্যবহার যেন উৎপাদনশীল হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”