আবু কাওসার
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৫৩ এএম
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান ৫৫০ কোটি ডলার (৫.৫ বিলিয়ন) ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির টাকা ছাড়ের জন্য দেওয়া শর্তগুলোর বেশিরভাগ পূরণই করেছে বাংলাদেশ। তবে একটি শর্ত কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবারও পূরণ হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে শর্ত বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে আগামী ২৯ অক্টোবর দুই সপ্তাহের জন্য ঢাকায় আসছে আইএমএফ মিশন।
প্রসঙ্গত, পঞ্চম কিস্তি পর্যন্ত অর্থছাড়ের জন্য রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে ঋণ কর্মসূচির শুরু থেকে প্রায়ই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ায় ষষ্ঠ কিস্তির জন্য তা বাধ্যতামূলক করা হয়। এদিকে গত দুই অর্থবছর দেশে রাজস্ব আদায় ভালো হয়নি। চলতি অর্থবছরের সর্বশেষ তিন মাসেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। তবে নীতিনির্ধারকরা প্রত্যাশা করছেন, অধিকাংশ শর্তই পূরণ হওয়ায় এবারও বাংলাদেশ অর্থছাড় পাবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ টাকা পাওয়া যাবে। ষষ্ঠ কিস্তির টাকা ছাড় হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরে। কিন্তু আইএমএফ সংস্কার কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে নতুন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর এ অর্থছাড়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
যেসব শর্ত পূরণ হয়েছে
আইএমএফের দেওয়া যেসব শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, জ্বালানি-সার আমদানি বাবদ বকেয়া কমানো, বিনিময়হার বাজারভিত্তিক করা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভেঙে দুটি আলাদা বিভাগ করা, ভর্তুকি কমানো, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা ইত্যাদি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় ষষ্ঠ কিস্তির টাকা ছাড় পেতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় অধিকাংশই পূরণ করেছে সরকার। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় এ বিষয়ে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের সভায় অব্যাহতি চাওয়া হবে। আশা করছি, এ প্রস্তাব গ্রহণ করবে আইএমএফ।’
বুধবার ঢাকায় আসছে আইএমএফ মিশন
এদিকে ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির শর্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আইএমএফের ডেভেলপমেন্ট মাইক্রো ইকোনমিক্স বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আগামী বুধবার দুই সপ্তাহের জন্য ঢাকা সফরে আসছে। তারা ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির প্রায় ৮০ কোটি ডলার ছাড়ের জন্য জুনভিত্তিক শর্তগুলো বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। প্রতিনিধিদলটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে।
আইএমএফের সঙ্গে চলমান ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিটি শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি ও ডিসেম্বরে এবং ২০২৪ সালের জুনে মোট তিন কিস্তিতে আইএমএফ থেকে মোট ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। জটিলতা দেখা দেয় চতুর্থ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে পাওয়ার কথা ছিল। পরে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির মোট ১৩০ কোটি ডলার গত জুনে একসঙ্গে পাওয়া গেছে। এই হিসাবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৬০ কোটি ডলার বা ৩.৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বহিস্থ ঝুঁকি সামাল দিতে গত বছরের ডিসেম্বরে নতুন করে ৮০ কোটি ডলার ঋণের জন্য আবেদন করে। বাড়তি ঋণ দিতে সম্মতি দেয় আইএমএফ। ফলে চলমান ঋণ কর্মসূচির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি ডলারে। বর্তমান বিনিময়হার অনুযায়ী যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
কর আদায়ে ঘাটতি ৬৪ হাজার কোটি টাকা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী গত জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু এ সময়ে আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। এজন্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, চলমান অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে খরা ও এনবিআরকর্মীদের আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেছেন, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব আদায় ও নীতি বিভাগ আলাদা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারিসহ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতেও নানা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে ঋণ পাওয়া যাবে না, এমনটি নয়। তবে ইতোমধ্যে কয়েকবার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় পর্ষদে অব্যাহতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বারবার অব্যাহতি চাওয়া সরকারের জন্য বিব্রতকর।
রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে
আইএমএফের শর্তানুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। ডিসেম্বর ও মার্চের রিজার্ভ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই উন্নতির কৃতিত্ব দিয়েছেন রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও আমদানি কমে যাওয়াকে। তিনি বলেন, ‘অর্থ পাচার কমে যাওয়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। আমদানি কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কোনো চাপ পড়েনি। চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেশি। এ কারণে ধীরে ধীরে রিজার্ভ বাড়ছে বলে মনে করেন খ্যাতনামা এই অর্থনীতিবিদ।
এ ছাড়া জ্বালানি ও সার আমদানির বকেয়া পরিশোধে আইএমএফ যে সীমা বেঁধে দিয়েছিল, বাংলাদেশ তার অনেক নিচে রয়েছে। জুনে এই দুটি খাতে বৈদেশিক পাওনা ৮৭ কোটি ডলারের নিচে এবং স্থানীয় পাওনা ২৮ হাজার কোটি টাকার নিচে রাখার শর্ত ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জুনে বৈদেশিক পাওনা ৩১ কোটি ডলার এবং স্থানীয় পাওনা ১৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
৫০০ কোটি ডলার বৈদেশিক পাওনা পরিশোধ
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক পাওনা বাবদ ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বকেয়া ছিল সাড়ে ৩০০ কোটি ডলার। অন্যান্য শর্তের মধ্যে বিনিময়হার বাজারভিত্তিক করায় বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা এসেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভতুর্কির চাপ কিছুটা সহনীয় করা হয়েছে। বাজেট ঘাটতিও নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে।