এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪২ এএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪২ এএম
দেশে প্রতিদিনের গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭১৬ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসছে ১ হাজার ৭৫৬ কোটি ঘনফুট। বাকি ৯৬০ কোটি ঘনফুট জোগান দেওয়া হচ্ছে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। সব মিলিয়ে দেশে এখনও গ্যাসের ঘাটতি ১ হাজার ৮৪ কোটি ঘনফুট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘাটতি আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে। কারণ প্রতিবছর দেশীয় উৎপাদন কমছে প্রায় ২০০ এমএমসিএফ করে।
এদিকে ঘাটতির কারণে গ্যাস সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাতগুলো। অন্যদিকে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় নির্ভরতা বাড়ছে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পেট্রোবাংলা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের।
কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি
অভিযোগ উঠেছে, এমন সংকটময় সময়ে জ্বালানি খাতে নতুন কোনো বড় উদ্যোগ বা পরিকল্পনা না নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছর পরেও তাই গ্যাস উৎপাদন বা অনুসন্ধানে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং স্থবিরতা দেখা দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন কমছে দ্রুত। দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালির প্রধান জ্বালানি উৎস বর্তমানে আমদানি করা এলএনজি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এই নির্ভরতার ওপর নতুন হুমকি সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নইলে দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাত দুটোই গভীর সংকটে পড়বে বলে তাদের আশঙ্কা।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় দুটি গ্যাসক্ষেত্রÑ তিতাস ও বিবিয়ানায় উৎপাদন কমছে নিয়মিত। মৌলভীবাজার ও জালালাবাদসহ আরও কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রেও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১৮২ থেকে ১৮৫ কোটি ঘনফুটে। নতুন কূপ খননের পরও পুরনো কূপের উৎপাদন হ্রাসে মোট উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষিতে গ্যাস ঘাটতি মেটাতে বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সাল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু করে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে তা জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়। চলতি বছর মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো জাহাজ আনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। যার মধ্যে ২২টি ইতোমধ্যে এসেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে বাকি জাহাজগুলো সময়মতো পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এমন প্রেক্ষাপটে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি উঠছে জোরেশোরে।
বিকল্প উৎস ও নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান প্রয়োজন
পেট্রোবাংলার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে এলএনজি পরিবহনে বাধা তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের বিদ্যুৎ, আবাসিক ও শিল্প খাতে। এলএনজি ছাড়া দেশের গ্যাস সরবরাহ চাহিদার কাছাকাছি রাখা সম্ভব নয় বলে সংস্থাটি জানায়।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি নেই। তবে এখনই বিকল্প উৎস ও নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলে গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। আমদানি-নির্ভরতা বাড়লে শুধু খরচই বাড়বে না, বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়বে। তাই স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ও অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘এলএনজির ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করায় সরকার প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করবে। সরকার ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনার চিন্তা করছে। যাতে সরবরাহে বৈচিত্র্য আসে।’
তেল আমদানিতেও সরকারি অনুমোদন
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের জন্য ২৮ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব তেল জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে ৮টি দেশের ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ-সংক্রান্ত আলোচনায় ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে এই অনুমোদন দিয়েছেন। বিপিসির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে থাকবে ১৯ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস অয়েল, ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন জেট এ-১, ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন, ৩ লাখ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০ হাজার মেট্রিক টন মেরিন ফুয়েল।
শিল্প খাতে প্রভাব
গ্যাস ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে, বিশেষত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পে। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মো. মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন তৈরি পোশাক শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বিজিএমইএর ৭ হাজার ১০০ সদস্যের মধ্যে বর্তমানে রপ্তানিতে সক্রিয় রয়েছেন ৩ হাজারেরও কম। এতে রপ্তানি আয়ে চাপ পড়ছে।’
আমেরিকা চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮১ দশমিক ৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এই খাতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।’
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ ও বৈশ্বিক শুল্ক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পোশাক খাতকে নিম্নমূল্যের পণ্য থেকে উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে যেতে হবে। এজন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি।’
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ ভবনে এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করতে হলে দাম অনেক বেড়ে যায়। তাই সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে জোর দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সোলার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্পগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, যা স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারবে না।’