× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বীমা খাত

বড় সমস্যা আস্থার সংকট

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২৪ এএম

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০০:০৪ এএম

বড় সমস্যা আস্থার সংকট

বড় আস্থা নিয়েই পথচলা শুরু করেছিল বীমা খাত, যা এখন সোনালি অতীত। দাবি পরিশোধে নয়ছয় করায় আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে এ খাত ঘিরে। তবে এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা। বর্তমানে দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের আটকে আছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। কারণ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধ করছে না। ফলে বীমা খাতে প্রতিনিয়তই আস্থাহীনতা বাড়ছে। তবে সাধারণ মানুষের দাবি যাতে পরিশোধ করা হয়, সে ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। 

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ লোপাট, ব্যর্থ বিনিয়োগ, নীতিগত অবহেলা ও ইচ্ছাকৃত অর্থ আটকে রাখার প্রবণতা বীমা খাতের দুরবস্থার জন্য দায়ী। ব্যাংক খাতের মতো বীমা খাতেও বড় আর্থিক লোপাটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অদক্ষ বিনিয়োগ ও আর্থিক নয়ছয় করার নেতিবাচক ঘটনা খাতটির সম্ভাবনায় চিড় ধরাচ্ছে। 

আস্থাহীনতার পেছনে যেসব কারণ

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের হাজার হাজার বীমা গ্রাহক বছরের পর বছর কোম্পানির কাছে ঘুরেও তাদের পাওনা টাকা পাচ্ছেন না। অর্থ লোপাট, অদক্ষ তহবিল ব্যবস্থাপনা ও অপরিপক্ব বিনিয়োগে জর্জরিত বীমা খাত এখন গভীর আর্থিক সংকটে। গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যবসায়িক আস্থা কমছে এবং নতুন গ্রাহকও বিমুখ হচ্ছে।

বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস পরিচালিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোম্পানিগুলোর একাংশ দাবি পরিশোধ করতে পারছে না; এটিই বীমার প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতার বড় কারণ। এ কারণে মানুষের মধ্যে জীবনবীমা গ্রহণের হার বাড়ছে না। মানুষ মনে করছে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি দূর করতে গিয়ে শেষ জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার অর্থ হয় না। যদিও বীমা খাতের জন্য বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময়।

গবেষণা জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মতে, তারা স্বাস্থ্যজনিত জরুরি অবস্থায় অর্থের জোগান নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তা ছাড়া সন্তানদের শিক্ষা, অবসর-পরবর্তী অর্থায়ন, সম্পদ ক্রয়, ভ্রমণ ও অবসর কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের। অথচ বীমা শব্দটি শুনলেই প্রথমে তাদের যে সমস্যার কথা মনে হয়, সেটি হচ্ছে আস্থাহীনতা। এ ছাড়া প্রক্রিয়াগত জটিলতা, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বীমা পলিসি করার ক্ষেত্রে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে সামাজিক মতামত। অর্থাৎ বীমা করার ক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আশপাশের মানুষ বা সমাজ যদি বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখে, তাহলে বীমার গ্রাহক বাড়বে। শিশুশিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, অপ্রত্যাশিত স্বাস্থ্য সমস্যা, সম্পদ ক্রয়, ভ্রমণ এবং অবসর-পরবর্তী অর্থায়নের জন্য সঞ্চয় বিষয়ে বীমা খাতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্রাহক কমছে, পাওনা মিলছে না

এনএসইউর এই গবেষণা প্রতিবেদন মতে, জীবনবীমার গ্রাহক ধীরে ধীরে কমছে। ২০০৮ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে জীবনবীমার গ্রাহক ছিলেন দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০১৯ সালে সেটি কমে দশমিক ৩৮ শতাংশ হয়। ২০২২ সালে সেটি আরও কমে দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। একইভাবে সাধারণ বীমা গ্রাহকের সংখ্যাও কমেছে। অথচ বীমার গ্রাহক ১ শতাংশ বাড়লে দেশের জিডিপিতে ২ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়।

প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, গ্রাহকদের আস্থাহীনতার বড় কারণ তাদের প্রত্যাশা বা বীমা দাবি পরিশোধ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। সব কোম্পানি যে দাবি পরিশোধ করছে না তা নয়। ১৯টি কোম্পানি ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত বীমা দাবি পরিশোধ করছে। ১০টি কোম্পানি ৭০ শতাংশের ওপর দাবি পরিশোধ করছে। যারা দাবি পরিশোধ করে না, সেই সংখ্যাটা কম। কোম্পানিগুলোতে সুশাসনের অভাবের কারণেই দাবি পরিশোধ হচ্ছে না। পুরো বীমা খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। 

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্যমতে, ৭৫টি জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানির মধ্যে অনেকে বছরের পর বছর গ্রাহকের দাবি ঝুলিয়ে রেখেছে। বীমা আইন অনুযায়ী মেয়াদপূর্তির ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধ বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তা কাগজে সীমাবদ্ধ।

আইডিআরএর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে; ৩৬টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জীবন বীমা কোম্পানিগুলো দাবি পরিশোধ করেছে মাত্র ৩৫ শতাংশ, আর সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে হার ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৯২ শতাংশ দাবি এখনও ঝুলে আছে।

সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে সরকারি সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি), যার গ্রাহক পাওনা ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে গ্রীন ডেল্টা (গ্রাহক পাওনা ২৭০ কোটি টাকা), প্রগতি (পাওনা ১৬৪ কোটি টাকা), রিলায়েন্স (পাওনা ১০১ কোটি টাকা) এবং পিপলস ইনস্যুরেন্স (পাওনা ৮১ কোটি টাকা)। মোট ৪৬টি নন-লাইফ কোম্পানির কাছে পাওনা ৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার মধ্যে পরিশোধ হয়েছে মাত্র ৩০০ কোটি, অর্থাৎ এখনো ৯২ শতাংশ দাবি অনিষ্পন্ন।

নন-লাইফ বীমার দুরবস্থার কারণ

নন-লাইফ বীমার এই অবস্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে মালিকদের অর্থ আটকে রাখার মানসিকতা, গ্রাহকের অসম্পূর্ণ কাগজপত্র, সার্ভে রিপোর্টে বিলম্ব, এসবিসি থেকে পুনর্বীমার অর্থ ফেরত না পাওয়া এবং বিনিয়োগের ভুল সিদ্ধান্তকে। এক বীমা কোম্পানির সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নন-লাইফ বীমায় বছরের শেষে হিসাব বন্ধ হয়ে যায়। মুনাফা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এরপর বড় কোনো দাবি এলে সেটি পরিশোধের অর্থ থাকে না।’

সংকটাপন্ন অবস্থা জীবন বীমায়ও। ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকের দাবি ৫ হাজার ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা; পরিশোধ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ৬৬ লাখ। বকেয়া রয়ে গেছে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যার পুরোটাই ২৯ কোম্পানির। শীর্ষে রয়েছে ফারইস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স (২ হাজার ৭৪২ কোটি ৯১ লাখ টাকা), এরপর পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স (২৪৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা), প্রগ্রেসিভ লাইফ (১৫৫ কোটি টাকা) এবং বায়রা লাইফ (৭৯ কোটি টাকা)।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ বলেছেন, ‘লাইফ ও নন-লাইফের বেশকিছু কোম্পানিতে অর্থ লোপাট হয়েছে। এ কারণে কোম্পানিগুলো অর্থসংকটে ভুগছে এবং গ্রাহকের দাবি মেটাতে পারছে না। কিছু কোম্পানির জন্য সবাই বীমা খাতকে ঘৃণা করছে। আমরা পরিস্থিতি পাল্টানোর চেষ্টা করছি। যারা টাকা নিয়ে পালিয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা