উন্নয়ন প্রকল্প
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৫ এএম
মোগল আমলে ‘মুলঙ্গী’ সম্প্রদায়ের মানুষের হাত ধরে সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় দেশীয় লবণ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এখন অবশ্য এ শিল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে কক্সবাজার জেলা, অন্যদিকে চট্টগ্রামের শুধু বাঁশখালী উপজেলাতে এই শিল্প টিকে আছে। তবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে কক্সবাজারে লবণ চাষের কয়েক হাজার ভূমি হাতছাড়া হওয়ায় নতুন লবণ মাঠের সন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক)। আর বিসিকের এই অনুসন্ধানে উঠে আসছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও আনোয়ারা উপজেলার নাম। ফলে নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার নতুন এক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে। যে সম্ভাবনা নতুন স্বপ্ন মাথাচাড়া দিচ্ছে এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে।
বিসিকের তথ্য অনুসারে দেশে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ হয়েছে গত ১৭ মে। চলতি বছর দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ লাখ ১০ হাজার টন। ১৭ মে পর্যন্ত ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ টন লবণ উৎপাদন হয়। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ টন।
চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা থেকেই বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ লবণ সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রাম বিভাগে যেটুকু লবণ চাষ হয়, তার অধিকাংশই হয় কক্সবাজার জেলায়। আবার কিছু লবণ চাষ হয় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। তবে নতুন করে সন্দ্বীপ ও আনোয়ারায় লবণ চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে কক্সবাজার বিসিকে অবস্থিত লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুই জায়গাতেই আগে লবণ চাষ হতো। পরে বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এখন আনোয়ারাতে দুধকুমড়া এলাকায় ছোট একটা জায়গায় চাষ হচ্ছে। এটা আরও কিছু বাড়ানো যেতে পারে। তবে সন্দ্বীপের দিকে তিন-চারটা জায়গা পাওয়া গেছে যেখানকার মাটি ও পানি দুটোই লবণ চাষের জন্য ভালো। ওইসব এলাকায় পর্যাপ্ত জায়গাও আছে। এখানে অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা আছে। তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি।’
গত কয়েক বছরে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ছেড়ে দিতে হয়েছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মহেশখালী ইকোনমিক জোন, মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এসবের জন্য অনেক জায়গা অধিগ্রহণ হয়েছে। সঠিক হিসাবটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না, তবে ৪-৫ হাজার একর লবণ মাঠ কমেছে ওই এলাকায়।’
একসময় লবণ শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল সন্দ্বীপ। গত কয়েক দশকে সেখানে লবণ চাষের ইতিহাস নেই। নদী ভাঙন ও পানির বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই শিল্প হারিয়ে যায়। এখন এখানে বিশাল চর জেগেছে। নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় স্থানীয়রা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। এর মধ্যে লবণ চাষি সমিতি নামে একটি সংগঠন করে কাজ শুরু করেছে সেখানকার বাসিন্দারা। স্থানীয় অধিকারকর্মী ও রাজনীতিবিদ মনিরুল হুদা বাবনের সভাপতিত্বে সন্দ্বীপ উপজেলা কমপ্লেক্সে এক সভায় মাস্টার মিলাদকে আহ্বায়ক, আজগর হোসেন সেলিমকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মাওলানা ইউসুফকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যবিশিষ্ট সন্দ্বীপ উপজেলা লবণ চাষি সমিতির কমিটি গঠিত হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল হুদা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একাধিকবার ফিজিবিলিটি স্টাডি করে এখানকার পানি ও ভূমিকে লবণ চাষের জন্য উপযোগী বলে প্রমাণ পেয়েছে বিসিক। তারা বলছে, এখানকার লবণের গুণগত মানও হবে ভালো। তারা এখানকার চাষিদের প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সহযোগিতা করতে চায়। আগ্রহীদের সঙ্গে বিসিকের সম্পর্ক তৈরিতে আমাদের সমিতি কাজ করবে। হারানো শিল্প ফিরে পাওয়ার বিষয়টাও আনন্দের।’
উল্লেখ্য, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ দশমিক ৩৭ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে, যা দেশের ভোজ্য লবণের চাহিদা পূরণ করে। তাই ভোজ্য লবণের জন্য আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং এখন বাংলাদেশ লবণ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। তবে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে লবণ আমদানি অব্যহৃত আছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩১ লাখ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১০ লাখ মেট্রিক টন ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানি হয়েছে, যা মূলত কস্টিক সোডার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আমদানি করা হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা লবণ চাষের আওতায় আনার কর্মপরিকল্পনা ও সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করার পাশাপাশি আমদানি রোধ করা গেলে দেশীয় লবণ শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।