প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ২২:১৮ পিএম
ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা জবর দখলের পর এস আলম এ ব্যাংক ধ্বংসের নীলনকসা আঁকে। সেই ধরারাবাহিকতায় ব্যাংকের সেবার মান জলাঞ্জলি দিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়া পরিচয়ে দোকানদার, বাড়ির কাজের বুয়া, অটো চালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী ও সাম্পানের রংমিস্ত্রীসহ কয়েক হাজার অদক্ষ, অশিক্ষিত ও অর্ধ্বশিক্ষিত লোক অবৈধভাবর নিয়োগ দেয়। কোন বিজ্ঞাপন ও চাকরির পরীক্ষা ছাড়াই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেয়া চিহ্নিত লোকবল দাঁড়িয়েছে ৮ হজার ৩৪০ জন। নিয়োগকৃত এসব কর্মকর্তা কর্মচারির ম্যধ্যে অনেকেই ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ব্যাংকে যোগদান করেন।
এদিকে ইতোমধ্যে অনেক ভুয়া সার্টিফিকেটধারিকে চাকরিচ্যূত করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের ভূয়া সনদ ও অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রকৃয়াধীন রয়েছে। অবৈধদের মধ্যে যারা এখনো ব্যাংকে রয়েছেন তাদের হাতে ভোল্ট ও ক্যাশ কাউন্টার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টের পর ব্যাংকটি এস আলমের লুটপাট জানাজানি হয়। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে নেয় এস আলম। আর ভুয়া নিয়োগে হানিয়ে নেয় কয়েকশ কোটি টাক। আর সিভির বাক্স বসিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ার লোক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয় অযোগ্যদের। তাদের যোগ্যতা পূনর্মূল্যায়নের জন্য সম্প্রতি ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেয়া হয়, তা বয়কট করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অবাধ্যতা প্রকাশ করে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা। তারা ব্যাংকের বিরুদ্ধে নানাবিধ অপপ্রচার করে সংবাদ সম্মেলন করছে এবং বর্তমান ম্যানেজমেন্টকে নানাবিধ হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে শুক্রবার ভোরে তারা ব্যাংকের ফেসবুক পেইজ হ্যাক করে। কতিপয় সন্ত্রাসীর ইন্ধনে তারা এসব কর্মকান্ড পরিচালনা করছে বলে জানা যায়। তারা ক্যাশ কাউন্টার ও ভোল্টে আক্রমন করতে পারে এমন শঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। যা নিরাপত্তা নিয়ে চাপে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংক সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের লোক নিয়োগ দেয়ায় অনেকটা আঞ্চলিক ব্যাংকের মতো হয়ে যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ব্যাংক। তারা অফিসে সব সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত। বারবার তাগাদা দেয়ার পরও তারা নিজেদের পরিবর্তন করেনি বরং দিন দিন তাদের উদ্ধত আচরণ আরো বেড়েছে। তাদের অদক্ষতা ও দুর্ব্যবহারের ফলে গ্রাহক সেবার মান চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন কেউ তাদের নিয়মের মাঝে আনতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পোষ্টিং বা চাকরি হুমকির মধ্যে ফেলত।
ব্যাংক আরও সূত্র জানায়, এস আলমের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যাংকের ম্যানেজার ও জোনাল হেডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আতংকের মাঝে রাখত। জাতীয় নির্বাচনের পর তারা এস আলম সহ আগের যায়গায় ফিরে আসবে বলে এখনও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এস আলমের অবৈধ নিয়োগ দেয়া এসব কর্মকর্তাদের পিছনে বছরে ব্যাংকের ক্ষতি প্রায় ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি। সেই হিসেবে ৭ বছরে প্রায় ১০ হজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংকটি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চাকরিচ্যূত এক কর্মকর্তা জানান, আমি কুড়িগ্রামের রকমারি শাখায় কর্মরত ছিলাম। আমাকে কারন ছাড়া কর্মচ্যূত করা হয়েছে। আমাদের অনেকে এখনো রয়েছেন, তারা চাকরি হারাতে পারেন। তারা তাদের মত চেষ্টা করছেন। কিন্তু চাকরিচ্যুতকে কেন্দ্র করে কিছু ঘটলে তার দায় আমরা নিব না।
এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি বাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মাসরুর আরেফিন বলেন, এস আলম একাই পুরো ব্যাংক খাত ধ্বংস করেছেন। তার ঘানি টানতে হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কাজ চলমান। ব্যয় কমাতে পারলে তা দ্রুত হবে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেসবুক পেজের প্রোফাইল ও কভার ছবি চেঞ্জ করে একটি হুমকিপূর্ণ বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টা ৪২ মিনিটে ব্যাংকটির অফিসিয়াল পেজের এক পোস্ট থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে হ্যাকার গ্রুপ। তবে পেজটির নাম পরিবর্তন করা হয়নি। এর প্রোফাইল ও কভার ফটো পরিবর্তন করে হ্যাকার গ্রুপটির ছবি দেওয়া হয়েছে।
হ্যাকার গ্রুপ দাবি করেছে, ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তাদের ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে সাইবার আক্রমণ চালানো হবে।
আমিনুল ইসলাম নামের একজন গ্রাহক তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, পটিয়ার অবৈধ ব্যাংকাররা চাকুরী রক্ষার আন্দোলন করেন। কিন্তু আপনাদের ডাকাত সর্দার এস আলম যে ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে তা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন করেন না কেন?
ইসলামী ব্যাংকের পাবলিক রিলেশন ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের হাতে এখন অনেক কিছু নিরাপদ নয়। তারা যেভাবে বিদ্রোহ করে ব্যাংকের নির্দিশনা আমান্য করেছে, তাতে তাদের কাছে ব্যাংকের ভল্ট বা ক্যাশ কাউন্টার কোন ভাবেই নিরাপদ নয়। এদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যাংকের ঝুকি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।