আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২১:৪৩ পিএম
দেশে ক্রমেই বাড়ছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার। কেনাকাটা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা খরচ মেটাতে মানুষ এখন ব্যাংকের কার্ডের ওপরই ভরসা করছেন বেশি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জুনের তুলনায় জুলাই মাসে দেশে-বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন কিছুটা কমেছে। প্রতিবেদনে দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের এবং দেশের ভেতরে বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরা হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতের অস্থির অবস্থার প্রভাব পড়েছে ক্রেডিট কার্ডেও। এ ছাড়া বর্তমান সরকার ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ফলে অনেক ক্রেডিট কার্ডধারীর অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে লেনদেনেও। তবে এই লেনদেন খরা বেশি দিন থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশিরা ৫৪৯ কোটি ৭ লাখ টাকা খরচ করেছিল। আর পরের মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশিরা বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে খরচ করেছে ৪৭৯ কোটি ৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে জুলাই মাসে বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন কমেছে ৭০ কোটি ৪ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে চলতি বছরের জুলাইয়ে বিদেশে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছে ৭৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। এরপর যুক্তরাজ্যে ৫৭ কোটি ৫ লাখ টাকা, থাইল্যান্ডে ৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৯ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ৩৮ কোটি ২ লাখ টাকা, ভারতে ২৭ কোটি ৯ লাখ টাকা, নেদারল্যান্ডসে ১৯ কোটি, সৌদিতে ১৫ কোটি, কানাডায় ২৫ কোটি, ইইউএতে ১৭ কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ কোটি, আয়ারল্যান্ডে ১৪ কোটি ও অন্যান্য দেশে ৭৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমে আসার কারণ প্রসঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারে পরিবর্তন আসার পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। ফলে তাদের সব ধরনের কার্ড ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। দেখা গেছে, ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা থাকলেও বিদেশে সেই অর্থ তারা খরচ করতে পারছেন না। অপরদিকে, বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কত খরচ করছেন, সেই তথ্যও প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তথ্য মতে, জুন মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে খরচ করেছিল ১৯৫ কোটি টাকা। আর পরের জুলাই মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছে ১৮৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে জুলাইয়ে বিদেশিরা বাংলাদেশে কম খরচ করেছে ৭ কোটি টাকা।
এ ক্ষেত্রেও শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নাগরিকরা বাংলাদেশে খরচ করেছেন ৪৪ কোটি টাকা। এরপর যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ১৮ কোটি টাকা খরচ করেছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছে ১৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে দেশের ভেতর ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন কম হয়েছে। জুনে দেশের ভেতর খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। আর পরে জুলাই মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে জুলাই মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর কম খরচ হয়েছে ৩১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডের বেশিরভাগই তিনটি ব্র্যান্ডেরÑ ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং অ্যামেক্স ১০ শতাংশ। দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বিল পরিশোধে। গত ডিসেম্বরে দেশের ভেতরে মোট ৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা লেনদেনের প্রায় ৪৯ শতাংশই হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। দেশের ভেতরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ গেছে খুচরা আউটলেট সেবার বিলে। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ইউটিলিটি বিল পরিশোধ হয়েছে ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ নগদ উত্তোলন, কাপড়ের দোকানের বিল পরিশোধে ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ওষুধে ৫ দশমিক ৪০, ট্রান্সপোর্টেশনে ৩ দশমিক ৩৫ এবং সরকারি সেবায় ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর অর্থ স্থানান্তর হয়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ব্যবসায়িক সেবায় ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং পেশাদারি সেবায় ব্যয় হয়েছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২৪ সালের মার্চে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এরপর গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তা কমে যায়। সরকার পরিবর্তনের পর গত সেপ্টেম্বর থেকে আবার বেড়েছে।
অন্যদিকে গত ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে দেশের বাইরে ৪৯২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ গেছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বিল পরিশোধে। খুচরা আউটলেট সেবায় ব্যয় হয়েছে ১৭ শতাংশ। ওষুধে ১০ শতাংশ এবং ট্রান্সপোর্টেশনে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ ছাড়া কাপড়, ব্যবসায়িক সেবা, পেশাদারি সেবা, নগদ উত্তোলন, সরকারি সেবা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে গেছে বাকি অর্থ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ‘লেস ক্যাশ’ সোসাইটি গঠনের কথা বলছে এবং নগদ লেনদেন কমিয়ে কার্ড এবং অ্যাপভিত্তিক লেনদেনের প্রচলন বাড়ানোর জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক অনেক লেনদেন হচ্ছে।