প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:২৭ পিএম
ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরছে পুঁজিবাজার। কিন্তু বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের দেশের পুঁজিবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিনিয়তি বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার ছাড়ছেন। গত এক মাসে তাদের ৭৮১টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব কমেছে। বিদেশি ও প্রবাসীরা পুঁজিবাজার ছাড়লেও এ সময়ে বেড়েছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা।
দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজার ছাড়তে থাকেন, যা অব্যাহত থাকে চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমে ৯ হাজার ১৭৬টি।
তবে ২০ মে থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বাড়তে দেখা যায়। এই সময়ের মধ্যে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বাড়ে ৭৪টি। তবে এরপর থেকে আবার তাদের বিও হিসাব কমতে শুরু করে, যা সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসজুড়েও অব্যাহত ছিল। অথচ আগস্ট মাসজুড়ে পুঁজিবাজার ছিল বেশ ইতিবাচক। এ সময়ে মূল্যসূচকে যেমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, তেমনি লেনদেনের গতিও বেড়েছে।
বিও হলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস অথবা মার্চেন্ট ব্যাংকে একজন বিনিয়োগকারীর খোলা হিসাব। এই বিও হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে লেনদেন করেন। বিও হিসাব ছাড়া পুঁজিবাজারে লেনদেন করা সম্ভব না। বিও হিসাবের তথ্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।
এই সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে (৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ২১১টি, যা গত ৩১ জুলাই ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৮টি। এ হিসাবে গত এক মাসে পুঁজিবাজারে বিও হিসাব কমেছে ৩৭টি। এই বিও হিসাব কমার মূল কারণ বিদেশি ও প্রবাসীদের পুঁজিবাজার ছেড়ে চলে যাওয়া।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। পদত্যাগ করে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে এ সরকারের প্রায় সাড়ে ৭ মাস পার হয়েছে। হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথম চার কার্যদিবস পুঁজিবাজারে বড় উত্থান হলেও, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে পতনের পাল্লা ভারী হয়েছে। বাজারে মন্দা দেখা দিলেও বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও, বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে। সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ৭৭২টি। গত ৩১ জুলাই বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৪৪ হাজার ৫৫৩টি। অর্থাৎ গত এক মাসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৭৮১টি।
অপরদিকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের সময় বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৪৭ হাজার ৮৪টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন ছিল ৪৭ হাজার ৮১টি। অর্থাৎ বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কমেছে ৫৮৭টি।
বিদেশিদের বাংলাদেশের বাজার ছাড়ার এ প্রবণতা চলছে আরও আগে থেকেই। ২০২৩ নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমছে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১১ হাজার ৭৪০টি।
বিদেশি ও প্রবাসীরা দেশের পুঁজিবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৭টি, যা গত ৩১ জুলাই ছিল ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ২০০টি। অর্থাৎ গত এক মাসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৬৮৭টি।
এখন পুঁজিবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও এর আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ২১১টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৪০টি।
এদিকে বর্তমানে পুঁজিবাজারে যে বিনিয়োগকারীরা আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫টি। গত ৩১ জুলাই এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৫টি। অর্থাৎ গত এক মাসে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব বেড়েছে ৩৫০টি।
অন্যদিকে বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ২৯৪টি। গত ৩১ জুলাই এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৮টি। এ হিসাবে গত এক মাসে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪৪৪টি।
পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি গত এক মাসে কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৫৫২টি। গত ৩১ জুলাই এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৪৯৫টি। এ হিসাবে এক মাসে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ৫৭টি।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৩টি, যা গত ৩১ জুলাই ছিল ১১ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৭টি। অর্থাৎ গত এক মাসে একক নামে বিও হিসাবে বেড়েছে ১ হাজার ৭১৬টি।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬টি। গত ৩১ জুলাই যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬টি। অর্থাৎ গত এক মাসে যৌথ বিও হিসাব কমেছে ১ হাজার ৮১০টি।