প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৩ পিএম
প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছিল আলোচিত ‘আমার গ্রাম আমার শহর : পাইলট গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প’। প্রকল্পটিতে এমন ১৫টি খাত যুক্ত করা হয়েছিল যেগুলো তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে এসব কাজ করে থাকে। অবশেষে অন্তবর্তীকালীন সরকার যাচাই-বাছাইয়ের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শতকোটি টাকার এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না- এমন কাজগুলোই প্রকল্পে বেশি ছিল। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শুধু বেতন-ভাতার খরচ ছাড়া বাকি যেসব কাজ শুরু হয়নি সেগুলো স্থগিত ও অর্থছাড় বন্ধ রাখার।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মো. ছায়েদুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পটির অনেকগুলো কাজ এলজিইডির কাজের সঙ্গে যায় না। এ ছাড়া অর্থের অভাবে এলজিইডি নিজস্ব কাজই ঠিকমতো করতে পারছে না। সেখানে অন্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নিজেদের অর্থে কীভাবে করবে? পিইসি সভায় বসে আলোচনার পর প্রকল্পটি চলবে নাকি বন্ধ করা হবে- সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে আর কিছু বলতে পারছি না।’
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পটির আওতায় বর্তমানে চলমান ৩৭টি স্কিমে ১৩৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার চুক্তিমূল্যের যেসব কাজ এখনও শুরু হয়নি- সেগুলো আপাতত স্থগিত রাখার সুপারিশ দেওয়া হবে পিইসি সভায়। এক্ষেত্রে প্রকল্পভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড়া অন্যান্য খাতের অর্থছাড় বন্ধ রাখতে বলা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম নির্ধারণে স্থানীয় চাহিদা বিবেচনা করা, জমি অধিগ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কাজ বাদ দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম নির্ধারণের সুপারিশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি মডেল গ্রামগুলোর ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, বাহুল্য কাজ পরিহার এবং সার্বিক প্রকল্প ব্যয় যৌক্তিক করার কথা বলা হবে। গ্রামগুলোকে কার্যকর করতে জীবন-জীবিকার উন্নয়নে অত্যাবশ্যকীয় কাজ রেখে বাকিগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ দেওয়া হতে পারে।
সূত্র জানায়, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫০ লাখ টাকা। সেটি বাড়িয়ে প্রথম সংশোধনীতে এক কোটি টাকা করে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নে ২১ কোটি ৯০ লাখ থেকে বাড়িয়ে করা হয় ২৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণে সাড়ে ৬২ লাখ থেকে কমিয়ে প্রস্তাব করা হয় ৪৫ লাখ টাকা। জলাধার বা নদীর পারে সবুজ প্রাঙ্গণ নির্মাণে সাড়ে ছয় কোটি থেকে বাড়িয়ে ২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়েছে। খাল খননে ১৭ কোটি ৭৫ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুকুর খননে ৫ কোটি ৮০ লাখ থেকে কমিয়ে দুই কোটি টাকা করা হয়েছে। গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ উন্নয়নে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। সড়কবাতি স্থাপনে নয় কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়। উন্নত চুলা সরবরাহে ৫৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য সাড়ে ৩৭ লাখ থেকে কমিয়ে কোনো খরচ ধরা হয়নি। ভিলেজ ব্র্যান্ডিংয়ে তিন কোটি থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি ২০ লাখ টাকা ধরা হয়। এ ছাড়া হাটবাজার উন্নয়ন ও কৃষিপণ্য কালেকশন সেন্টারের জন্য ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫১ কোটি ২০ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়। তবে এসব ব্যয় ও খাত বাদ দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ দিতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের ডিপিপি সূত্রে জানা গেছে, গ্রামে শহরের নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে ২০২৩ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে এলজিইডি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু গত জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুকূলে খরচ হয়েছে ২৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের তিন দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ।
প্রকল্পের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক ও অনুমোদিত সমীক্ষা ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি নীতিমালা বা গাইডলাইনের আলোকে প্রকল্পের সঙ্গে ১৫টি গ্রাম যুক্ত করা হয়। পাইলট ভিত্তিতে কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য গ্রামগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছিল। এসব গ্রামকে পরীক্ষামূলক শহরে রূপান্তর করতে কাজও শুরু হয়। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্পের অগ্রাধিকার তালিকা নির্ধারণ সংক্রান্ত সভায় এ প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়। পরে এলজিইডির চাহিদা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুরোধে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রকল্পের কাজগুলো রিমডেলিং এবং প্রকল্পে ব্যয় কমিয়ে সীমিত পরিসরে অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনীর উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ।