× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংক খাত

রক্ষক যখন ভক্ষক!

আহমেদ ফেরদাউস খান

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৩ পিএম

রক্ষক যখন ভক্ষক!

যাদের দায়িত্ব ছিল রক্ষা করা তারাই ভক্ষক হয়ে পুরো ব্যাংক খাতের বারোটা বাজিয়েছে। লুটেরা গ্রুপের ভৃত্যের মতো কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দিয়েছেন। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ব্যাংক খাত লুটপাটে ছিলেন সবার শীর্ষে। কম যাননি সাবেক গভর্নর ফজলে কবির ও আতিউর রহমানও। তাদের সঙ্গ দিয়েছেন আরও ৬ ডেপুটি গভর্নর। অর্থনীতি পাহারার বদলে তারাই লুটপাটের পথ প্রশস্ত করেছেন। যে হাতে তারা টাকায় স্বাক্ষর করেছিলেন, ওই একই হাতে স্বাক্ষর করেছিলেন লুটপাটের চুক্তিতেও। অবশেষে শেষ রক্ষা হচ্ছে না তাদেরও। দেরিতে হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে তাদের আমলনামা। তাদের আর্থিক খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর ও ছয় ডেপুটি গভর্নরের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তলব করেছে বিএফআইইউ। দুদকের অনুরোধে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ফরম, লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ, কেওয়াইসি ফরমসহ সব তথ্য আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে। যদি কোনো হিসাব বন্ধ হয়ে থাকে, সেটির তথ্যও জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাবেক তিন গভর্নর ছাড়াও যাদের হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা হলেনÑ এসকে সুর চৌধুরী, মো. মাসুদ বিশ্বাস, আবু হেনা মো. রাজী হাসান, এসএম মনিরুজ্জামান, কাজী ছাইদুর রহমান ও আবু ফরাহ মো. নাছের।

আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ের পর ড. আতিউর রহমান দেশত্যাগ করেন ও পালাতক আছেন ফজলে কবির। আব্দুর রউফ তালুকদার পলাতক অবস্থায় গত বছরের ৭ আগস্ট ই-মেইলে পদত্যাগ করেন। তাদের স্ত্রী, সন্তান এবং সন্তানদের স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বিএফআইইউ।

সরকার পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নানা অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে ব্যাংক খাত থেকে নামে-বেনামে বিভিন্ন গ্রুপ প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ করে দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার অতি আস্থাভাজন হওয়ায় যখন-তখন যোগাযোগ করতে আব্দুর রউফ তালুকদারের কোনো পর্দা ছিল না। লুটেরা গোষ্ঠীর ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করেন আবদুর রউফ তালুকদার। পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পেলেও দুই বছরে দেশের ব্যাংক খাতকে তিনি ক্ষত-বিক্ষত করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ ক্ষতি তৈরি হয়েছেÑ এমন ঘটনা অতীতে আর কখনও ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি সব অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ তিনিই একমাত্র গভর্নর, যিনি সরকার পরিবর্তনের পর পালিয়ে যান এবং পলাতক থেকেই পদত্যাগ করেন।

গভর্নরদের মধ্যে ‘আজ্ঞাবহ’ গভর্নর হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১তম গভর্নর ফজলে কবির। ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের সুযোগ-সুবিধা দিতে কাউকে অখুশি করতেন না। গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশের ইতিহাসে আইন পরিবর্তন করে দ্বিতীয় মেয়াদে নিযুক্ত করা হয় তাকে। এর আগে অর্থ সচিব ও রেলপথ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফজলে কবির গভর্নরের দায়িত্বে থাকাকালে সরকারের কোনো সিদ্ধান্তেই আপত্তি জানাননি। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা, ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা, নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক পরিচালকদের জন্য আইন পরিবর্তন, সুদহার ৯ শতাংশ করাÑ কোনো ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলেননি তিনি। অর্থাৎ তিনি যা করেছেন সবই ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ছিল প্রভাবশালীদের চাপও। এসব কারণে বেশ সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।

ব্যাংক খাতে বিপর্যয়ের অন্যতম কারিগর ড. আতিউর রহমান। যিনি নিজের দারিদ্রতাকে কাজে লাগিয়ে হয়েছেন দুর্নীতিবাজ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলেন এবং পরিদর্শন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেন সাবেক এই গভর্নর। ব্যাংক খাতে লুটপাটের সুযোগ করে দেন তিনি। তার সময়ে নীতিমালার শিথিলতায় শুরু হয় জালিয়াতি। ওই সময়ে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ক্রিসেন্ট, অ্যাননটেক্সের জালিয়াতি প্রকাশিত হয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দেওয়া নয় ব্যাংকের কোনোটিই দাঁড়াতে পারেনি। অপরিকল্পিত ও অদক্ষ আইটি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের কারণে রিজার্ভ চুরির সুযোগ তৈরি হয়। অদক্ষতা, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বকীয়তাকে খর্ব করা, ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ায় খাতটি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। তিনিই মূলত ব্যাংক খাত ধ্বংসের মূল হোতা। তার সময়েই ব্যাংকের সব সূচকের অবনতি ঘটে।

আওয়ামী সরকারের তিন মেয়াদের পূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালনকারী এই তিন গভর্নরদের যারা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন তারা হলেনÑ সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী, মো. মাসুদ বিশ্বাস, আবু হেনা মো. রাজী হাসান, এসএম মনিরুজ্জামান, কাজী ছাইদুর রহমান ও আবু ফরাহ মো. নাছের। এদের মধ্যে শুধু এসকে সুর চৌধুরী ও মাসুদ বিশ্বাস বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।

২০১০-২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্ক গ্রুপের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথম ও সবচেয়ে বড় অর্থ কেলেঙ্কারি। এরপর রিজার্ভ চুরি ও বিভিন্ন সময় বেসিক, জনতা, ফারমার্স এবং ইসলামী ব্যাংক কেলেঙ্কারিসহ অন্তত ২৫টি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ৯২-৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লোপাট হয়েছে। এসব কেলেঙ্কারিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও গ্রুপের নাম সামনে এলেও আড়ালে ছিলেন মাস্টারমাইন্ডরা। ব্যাংক খাতে মহাহরিলুটে নেতৃত্ব দিয়েছে একটি সিন্ডিকেট। যাদের কাছে জিম্মি ছিল ব্যাংকপাড়া। মূলত সর্ষের মধ্যে ভূত হয়ে ছিল বিএফআইইউ। অর্থ পাচার ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা এই সংস্থাটির সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস নিজেই অর্থ পাচারে সহায়তা করেছেন।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যাদের মৌলিক দায়িত্ব ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার কথা। তাদের অনেকেই ব্যাংকিং খাতের লুটপাট থেকে শুরু করে ধসে পড়ার পেছনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেনÑ এতে সন্দেহের অবকাশ নাই।’

গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা অন্যায় করেছে বা যারা ক্ষতির কারণ হয়েছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা বাঞ্ছনীয়। এজন্যই যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সবাইকে আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করবে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটা সভ্য সমাজের নিয়ম। তাতে যেই হোক না কেন, যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন। এই আইনের আওতায় নিয়ে আসার ধারাবাহিকতাও দরকার। নইলে আবারও আর্থিক খাতে সুশাসনের সংকট দেখা যেতে পারে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা