প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৯ এএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
দেশের রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থে ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। ছয় বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-তিন শাখায় একইসঙ্গে কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় এক হাজার ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে এক হাজার কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। ঋণের প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঋণচুক্তির প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। চলতি অর্থবছরেই প্রকল্পটি শুরু করে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মেহেরিন এ মাহবুব বলেন, গত ১২ জুন সরকারি খাতের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক বোর্ড। এই ঋণের একটি বড় অংশ থাকবে এনবিআরের সংস্কার প্রকল্পে। তবে চূড়ান্ত ঋণচুক্তির বিষয়টি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ নির্ধারণ করবে বলে জানান তিনি।
কেন এই প্রকল্প?
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০১২ অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাতও স্থবির হয়ে পড়ে, সর্বশেষ বছরে তা নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে-যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অথচ একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি দক্ষ ও আধুনিক কর ব্যবস্থার জন্য এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সরকার তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে-বাণিজ্যিক করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অসংখ্য ছাড়-সুবিধা থাকা ভ্যাট ব্যবস্থা এবং আয়করে বিভিন্ন ছাড় ও অবকাশ সুবিধা। এসব চ্যালেঞ্জ কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয় বলেই মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কী কী পরিবর্তন আসছে এনবিআরে
প্রকল্পটির আওতায় এনবিআরকে কাঠামোগতভাবে ঢেলে সাজানো হবে। রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষতা বাড়াতে এনবিআরের ভেতরে বিজনেস প্রসেস প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে, প্রশিক্ষণ, নীতি বিশ্লেষণ সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ-বহিঃযোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে। প্রতিষ্ঠা করা হবে একটি আধুনিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান ইউনিট।
কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আয়কর আদায় প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল করা হবে। বিদ্যমান এবং নতুন সফটওয়্যারের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা হবে যাতে তথ্য প্রবাহ সুষ্ঠুভাবে চলে এবং করদাতাদের হয়রানি কমে। আয়কর, ভ্যাট ও অন্যান্য সিস্টেমে একটি সমন্বিত ইউনিক আইডি চালু করা হবে যা করদাতার জন্য একক পরিচিতি হিসেবে কাজ করবে।
ভ্যাট প্রশাসনেও আনা হচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। প্রতিষ্ঠা করা হবে ‘এসএপি কম্পিটেনসি সেন্টার’, যাতে ইন্টিগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম (আইভিএএস) পুরোপুরি কার্যকর করা যায়। এর পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ই-আনভয়েসিং সিস্টেম চালু করা হবে, যাতে সেবা ও পণ্যের লেনদেন সহজে ট্র্যাক করা যায়।
কাস্টমস এবং ডিউটি ড্র ইনপুট অফিসকে (ডিইডিও) আধুনিকীকরণেও কাজ হবে। ছয়টি নতুন ডিজিটাল সিস্টেম তৈরি করা হবে। রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন প্ল্যাটফর্ম আইবিএএস-প্লাস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ডেটা প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে।
মানবসম্পদ ও অবকাঠামোতেও উন্নয়ন
প্রকল্পে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে। পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হবে। স্থায়ীভাবে একটি ‘আয়কর প্রশিক্ষণ একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমীক্ষা ও ডিজাইন করা হবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন ভ্যাট অফিসের অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মত
এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য এসেছে পরিকল্পনা কমিশন থেকেও। কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কেটে যাবে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার ও সক্ষমতা উন্নয়ন একযোগে হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে।’
বিশ্বব্যাংকের এই ঋণসহায়তায় এনবিআরের কাঠামো, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ-সবদিকেই এমন পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, যা এক দশকে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রথম বড় সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।