আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:০৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পুঁজিবাজারের কারসাজিতে জড়িত থাকায় ২৮টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবধারীকে অর্থদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এই দণ্ড দেওয়া হয় বলে বিএসইসির একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে।
এই ২৮টি বিও হিসাবধারীকে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে জড়িতরা ২১টি প্রতিষ্ঠানের নামে ২৩টি বিও হিসাব এবং ৪ ব্যক্তির নামে ৫টি বিও হিসাব ব্যবহার করেছে।
২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত সময়ে কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা হয়। ওই সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৮৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে যায়। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে বিএসইসি। কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় এনেছে সংস্থাটি।
কারসাজিতে জড়িতরা ইমিনেন্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সিয়াল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড এবং এসবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের বিভিন্ন নামে একাধিক বিও হিসাব খুলে কোম্পানির শেয়ার সিরিজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএসইসি কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকা ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের বিও হিসাবধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেÑ তোরা মনসুরাত শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতিকে ২০ লাখ টাকা, বাগড়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১৭ লাখ টাকা, মো. মাসুদুর রহমান শেখকে ১ লাখ টাকা, মহামায়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায়কে ১৬ লাখ টাকা, মহামায়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, মো. শাহজালাল আল সাফীকে ১ লাখ টাকা, চাঁদপুর শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, চাঁদপুর শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১৩ লাখ টাকা, শাহরাস্তি শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, দেবব্রত সরকারকে ৩ লাখ টাকা, কচুয়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিকে ৯ লাখ টাকা, পাটোয়ারি বাজার শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, পাটোয়ারি বাজার শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ঋণদান সমবায়কে ৪ লাখ টাকা, ওয়্যারলেস বাজার শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিকে ১ লাখ টাকা, নয়াহাট শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১১ লাখ টাকা, ফরিদগঞ্জ শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ৪ লাখ টাকা, গৃদকালিন্দিয়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, মো. জসিম উদ্দিনকে ১ লাখ টাকা, জে. এস এন্টারপ্রাইজকে ১১ লাখ টাকা, এসবি আমাদের পণ্য আমাদের বাজার লিমিটেডকে ১০ লাখ টাকা, এসবিসিএল হাউজিং লিমিটেডকে ১৯ লাখ টাকা, শিক্ষিত বেকার কেন্দ্রীয় সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ৫ লাখ লাখ টাকা, চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী কেন্দ্রীয় সমিতিকে ২৯ লাখ টাকা এবং চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে।
এদিকে এসব বিও হিসাবের মধ্যে বাগরা শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড, মো. মাসুদুর রহমান শেখ এবং কচুয়া শিক্ষিত বেকার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির নামে পৃথক ২টি করে বিও হিসাব রয়েছে।
শেয়ার কারসাজিতে জড়িতদের মধ্যে মো. জসিম উদ্দিন চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান ও শিক্ষিত বেকার কেন্দ্রীয় সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া দেবব্রত সরকার চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আর মো. মাসুদুর রহমান শেখ ও মো. শাহজালাল আল সাফী চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। এই চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির বেশ কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বিও হিসাব খুলে কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে সহযোগিতা করা হয়। এর মধ্যে এসবিসিএল আমাদের পণ্য আমাদের বাজার লিমিটেড, এসবিসিএল হাউজিং লিমিটেড ও শিক্ষিত বেকার কো-অপারেটিভ লিমিটেড।
এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে বিনিয়োগকারী মো. জসিম উদ্দিনসহ তার সহযোগীদের ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জসিম উদ্দিন ও তার সহযোগীরা ২০২১ সালের ২৮ জুন থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ আড়াই মাসে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কারসাজি করে দাম বাড়ায়। তার আগে ওই বছরের অক্টোবরে ইস্টার্ন ইনস্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে মো. জসিম উদ্দিনকে ১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। তার আগে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রভাতি ইনস্যুরেন্সের শেয়ার যোগসাজশের মাধ্যমে কারসাজির অভিযোগে মো. জসিম উদ্দিনকে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বিএসইসির ওই সূত্রটি জানায়, মো. জসিম উদ্দিন, দেবব্রত সরকার, মো. মাসুদুর রহমান শেখ, মো. শাহজালাল আল সাফী এবং তার সহযোগীদের একটি গোষ্ঠী ২৮টি বিও হিসাব ব্যবহার করে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার নিজেদের মধ্যে সিরিজ লেনদেন করে মূল্য বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কারসাজিকারীরা ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত সময়ে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময়ের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৫.৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.১০ টাকায় নিয়ে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৩.৬০ টাকা বা ৮৭.৭৪ শতাংশ বাড়ে।
সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত উল্লিখিত আইন ও তার অধীন জারিকৃত বিধি-বিধান পরিপালনে বিও হিসাবধারীদের ব্যর্থতা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯-এর সেকশন-২২ এর অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেহেতু কমিশনের বিবেচনায় সিকিউরিটিজ আইন পরিপালনে উল্লিখিত ব্যর্থতার জন্য, তথা পুঁজিবাজারের উন্নয়নের পাশাপাশি বাজারের শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা রক্ষার স্বার্থে জসীম উদ্দিন, দেবব্রত সরকার, মো. মাসুদুর রহমান শেখ, মো. শাহজালাল আল সাফী এবং তার সহযোগীদের জরিমানা করা প্রয়োজন ও সমীচীন, তাই কমিশন উল্লিখিত যাবতীয় বিষয় বিবেচনাপূর্বক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯-এর সেকশন ১৭ (ই) (২) এবং ১৭ (ই) (৫) লঙ্ঘন করার জন্য সেকশন-২২ এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে উক্ত বিও হিসাধারীদের জরিমানা ধার্য করল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দ্রা শিক্ষিত বেকার যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই বিষয়টা অনেক আগের। ইচ্ছাকৃত বা অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো লেনদেন করিনি। এই লেনদেন করার ক্ষেত্রেও কোনো আইন লঙ্ঘন করিনি। বিষয়টা অনেক আগেই বিএসইসিকে জানিয়েছি। তারপরও কেন এই জরিমানা তা আমার জানা নেই। ওই সময় সবাই ব্যবসা করছে কিন্তু তাদের কিছু বলছে না।’
বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি এখনও পুরোপুরি দায়িত্ব বুঝে পাইনি। তাই এই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে জি একাধিকবার কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। বিগত ১৫ বছরে এই পুঁজিবাজারে দরবেশ দিয়ে হঠাৎ করে দরপতন ঘটাত, যা ছিল নিয়মিত ঘটনা। এতে অনেক বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন এবং পুঁজিবাজার মূল কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। বাজার ধ্বংসে দায়ীদের এখন শাস্তি হচ্ছে, এটা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সুখবর। তাদের আরও কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই পুঁজিবাজার নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।’