আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:২৯ এএম
প্রবা গ্রাফিক্স
কিছুতেই পতনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। চলতি সপ্তাহের চার দিনসহ টানা ছয় কার্যদিবস দরপতন দেখল মূলধন বাজার। অব্যাহত এই পতনের কারণে পুঁজি হারাচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। গতকাল বুধবারও দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসূচক কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণও। এর মাধ্যমে টানা ছয় কার্যদিবস বাজারটিতে মূল্যসূচক কমল। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ার অতিমূল্যায়িত হওয়ার কারণে দরপতন হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সরকার ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কঠোর পদক্ষেপের কথাও জানান তারা।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাজারের ওপরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে তলানিতে। আস্থাহীন বাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তার ওপরে অল্প কিছু কোম্পানি ভালো করছে, বেশিরভাগই খারাপ করছে। তারপরেও যে বাজারে বিনিয়োগকারী বা ক্রেতার অভাব, সে বাজারে এমন দরপতন ঠেকানো কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু কাজ করতে হবে। প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী যারা আছেন, তাদের বাজারে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আনতে পারলে বাজার ভালো হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বলতে ব্যাংক, বীমা ও মিউচুয়াল ফান্ড। তাদের আনতে সরকার ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার যৌথ উদ্যোগ দরকার। সব বাজারেই বিনিয়োগযোগ্য শেয়ার থাকে। সেটা বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে হবে। তবে উদ্যোগ সবার আগে সরকারকে নিতে হবে।’
এদিকে ডিএসইতে মূল্যসূচকের পতনের পাশাপাশি দাম কমেছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দাম কমেছে বেশিরভাগ শেয়ারের। ফলে এ বাজারেও মূল্যসূচক কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।
এর আগে গত সপ্তাহের প্রথম তিন কার্যদিবসে উভয় পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে। তবে সপ্তাহের শেষ দুই কার্যদিবস উভয় বাজারেই দরপতন হয়। চলতি সপ্তাহের প্রথম তিন কার্যদিবসেও পতনের মধ্যে থাকে পুঁজিবাজার। টানা পাঁচ কার্যদিবস পতনের পর গতকাল বুধবার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে। তবে দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে দাম বেড়েছে ১২৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের। বিপরীতে দাম কমেছে ২০৬টির এবং দাম অপরিবর্তিত ছিল ৬৫টির। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১১২ পয়েন্টে নেমেছে।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৩৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ৬৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। সারা দিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩১৪ কোটি ১৬ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩২৮ কোটি ৩১ টাকা। সে হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এ লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের শেয়ার। টাকার অঙ্কে কোম্পানিটির ১২ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এডিএন টেলিকমের ১০ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ৭ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।
এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছেÑ ওরিয়ন ইনফিউশন, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এমজেএল বাংলাদেশ, ফারইস্ট নিটিং, মালিক স্পিনিং ও ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট।
অন্য বাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৪৩ পয়েন্ট। এ বাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৯টির দাম বেড়েছে। কমেছে ৯৭টির এবং ২৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
পুঁজিবাজারে বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাইলে গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে তখনই দরপতন হয়, যখন অতিমূল্যায়িত কোম্পানিগুলো শক্তিশালি কোম্পানি হয় না এবং তাদের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। দুর্বল কোম্পানিগুলো তাদের শেয়ারের দাম বাড়ানোর জন্য এটি করে থাকে। এরপর দাম উঠিয়ে তারা কারসাজি করে। এরপর ওই শেয়ারগুলোর দাম কমতে থাকে, কারণ এগুলো এমনিতেই সস্তা শেয়ার। এভাবে অতিমূল্যায়িত হওয়ার পর বাজারে দরপতন হয়। এর মূল কারণ তদারকি সংস্থাগুলোর দুর্বলতা বা অনেক সময় এ কাজ নিজেরাও করে থাকে নিজেদের স্বার্থে বা অন্য কোনো কারণে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেয়ার অতিমূল্যায়িত হলে ওই কোম্পানির শেয়ারের পতন হবেই। তদারকি সংস্থাগুলোর উচিত শক্ত হাতে এগুলো দমন করা। যাতে কেউ অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করে শেয়ারকে অতিমূল্যায়িত করতে না পারে।’