প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে গত নভেম্বরে। এক মাসে এক লাখ ৫৬ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। হিসাব অনুযায়ী বাৎসরিক বিবেচনায় এই লেনদেন ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলানায় ৩১ শতাংশ বেশি। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস গত জুলাইয়ের তুলনায় বেড়েছে ২৮ শতাংশ।
আলোচ্য মাসে প্রতিদিন ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। সরকারি বিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন কম হলেও সে ধাক্কা কাটিয়ে উঠে নভেম্বরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।
এক নজরে-
- নভেম্বরে দৈনিক লেনদেন ৫ হাজার কোটি টাকা
- এক মাসে গ্রাহক হিসাব বেড়েছে ১৬ লাখ
- দেশে বিকাশ, নগদসহ ১৩টি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে
- ফের ২০ বিলিয়নের নিচে নামলো রিজার্ভ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের জুলাই মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল এক লাখ ২২ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। আর নভেম্বর মাসে এক লাখ ৫৬ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। দৈনিক পাঁচ হাজার ২২৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে এ মাসে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের মার্চ মাসের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হলো এই লেনদেনের মাধ্যমে। কারণ এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে সর্বোচ্চ লেনদেন ছিল এক লাখ ৫৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ও তাৎক্ষণিক
আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস)
বা মোবাইল আর্থিক সেবা। শুধু অর্থ পাঠানোই নয়, অনেক নতুন সেবাও মিলছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, বিদেশ থেকে
টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ
মাধ্যমটি।
দেশে বর্তমানে বিকাশ, রকেট,
নগদসহ ১৩টি এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট
২৩ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার ৫১৫ জন। কিন্তু এক মাস আগেও নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২৩
কোটি ৫৭ লাখ। অর্থাৎ এক মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নতুন করে ১৬ লাখ গ্রাহক যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু আন্দোলনের সময় অর্থাৎ জুলাই মাসে এই গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২৩ কোটি ৩১ লাখ ২৭
হাজার।
নভেম্বর মাসে ক্যাশ ইন হয়েছে
৪৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। উত্তোলন (ক্যাশ আউট) হয়েছে ৫০ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া
নভেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে দুই হাজার
৮৪১ কোটি টাকা, বেতন ভাতা দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৬৩২ কোটি, মার্চেন্ট পেমেন্ট বা পণ্য
কেনাকাটায় ৭ হাজার ৭৭৫ কোটি ও রেমিট্যান্স এসছে এক হাজার ৭৭ কোটি টাকার।
২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম
চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের
মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর মধ্যে দিয়ে দেশে এমএফএস যাত্রা শুরু হয়। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের
সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিংসেবা চালু করে বিকাশ। বর্তমানে দেশে মোবাইল
ব্যাংকিং সেবার বেশির ভাগই বিকাশের দখলে। এরপর ‘নগদ’-এর অবস্থান। লেনদেন ছাড়াও মোবাইল
ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হচ্ছে অনেক নতুন নতুন সেবাও। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ সেবামূল্য
পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা
পাঠানো অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবা দেওয়া
হচ্ছে। বর্তমানে বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশ, মাই ক্যাশ, শিওর ক্যাশসহ নানা নামে ১৩টি ব্যাংক
ও প্রতিষ্ঠান এমএফএস সেবা দিচ্ছে।
এ ছাড়া গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী
ও গৃহপরিচারিকাদের বেতনও এখন দেওয়া হচ্ছে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো সেবামাধ্যম ব্যবহার
করে। পোশাক খাতসহ শ্রমজীবীরা এমএফএস সেবার মাধ্যমে গ্রামে টাকা পাঠাচ্ছেন। যার ফলে
দিন দিন নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। এ প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন
খাত সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, গত ১ জুলাই থেকে সরকারি
চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন ঘিরে
দেশে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হতাহত হন অনেকে। যার প্রতিবাদে গত ১৮ জুলাই সারা দেশে
‘কমপ্লিট শাট-ডাউন’ ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিন দুপুরে ইন্টারনেট সেবা সীমিত এবং
রাতে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ১৮ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট
ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় ব্যাংকের সব ধরনের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত আন্দোলন শুরু হলে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ
করে। এর মাধ্যমে সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করতে চায়। কিন্তু আমাদের সব ধরনের
ইন্টারনেট ব্যবস্থা একই ধারায় চলায় মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। তাই বিকল্প
ব্যবস্থা তৈরি করতে কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।