রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩৬ এএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৪৮ এএম
ফাইল ফটো
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ডলার সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকট অনেকটা কেটে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জরুরিভিত্তিতে গ্যাসের সমস্যা সমাধান করতে হবে। অন্যথায় পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিতে শর্ত শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার ফলে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই থেকে নভেম্বরে ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে। এমনকি দীর্ঘ সময় পরে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও ডলার সংকটের কারণে বেশ কিছুদিন আমদানিতে কড়াকড়ি শর্ত আরোপ ছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের আগস্টে সরকার বদলের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এতে ডলার সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কয়েক মাস ধরে ডলার বাজারেও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। গত মাসের শেষের দিকে বকেয়া পরিশোধের চাপে বাজার কিছুটা অস্থির হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ফের স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
তথ্যমতে, গত জুলাই থেকে নভেম্বরে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৯৮৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৯৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৫২ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট এলসি খোলা হয়েছে ২ হাজার ৮১২ কোটি মার্কিন ডলারের। গত বছরের একই সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮১০ কোটি ডলারের। সে হিসাবে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ২ কোটি ডলার। আর শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৯৮৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সেই হিসাবে গত ৫ মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৫২ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ডলারের সংকট দেখা দেয়। এরপর ডলার সাশ্রয়ে আমদানিতে কড়াকড়ি শর্ত আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এভাবে চলেছে প্রাই দুই বছরের বেশি সময়। তবে গত জুলাই থেকে রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স বেড়ে যায়। এরপর মার্জিন রাখার শর্তে গ্রাহক-ব্যাংকের সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে এলসি খোলা বেড়েছে। এখন আর ডলারের জন্য এলসি খোলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১১০ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের জুলাই থেকে নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার বা ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দুই বছর ধরেই দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি হচ্ছে না। ফলে জ্বালানি অপর্যাপ্ততার কারণে অধিকাংশ শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েক মাস ধরে শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ হয়েছে। এজন্য অধিকাংশ কোম্পানি এখন প্রয়োজন না হলে ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাপক হারে কমে গেছে।
বেসরকারি বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক খোরশেদ আলম গণমাধ্যমে বলেন, ‘শিল্পে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট কিছুতেই কাটছে না। সাভার, আড়াইহাজারসহ বস্ত্র খাতের বড় কারখানা রয়েছে– এমন সব জায়গায় গ্যাস সংকট আগের মতোই।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমদানি বাণিজ্য বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী এলসি ছাড়া চুক্তিপত্রের আওতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। বছরে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য এলসি ছাড়া বাণিজ্যিক আমদানি করা যায় বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চুক্তির আওতায় আমদানি তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টিং পোর্টালে দিতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন শিথিল করা হয়েছে।
ডলার বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র (নির্বাহী পরিচালক) হুসনে আরা শিখা বলেন, সম্প্রতি ডলার নিয়ে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। কোনো গ্রাহক কিংবা ব্যাংক ডলার সংকটের কথা জানায়নি। বরং ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার হোল্ডিং বেড়েছে। মূলত, ডলার পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় পণ্য আমাদানির জন্য এলসির শর্ত শিথিল করা হয়েছে। রেকর্ড রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ডলার আসায় ডলার সংকট কেটে গেছে। সেজন্য রিজার্ভও বেড়েছে।