ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১১:২১ এএম
রাজধানীতে চার দিনের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে অন্তত ৩০ টাকা কমে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূলত বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আগের মতো না থাকায় ডিমের দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, খামার থেকে ঢাকায় ডিম সরবরাহ করতে অন্তত পাঁচবার হাতবদল হয়, তার জায়গায় এখন করপোরেট কোম্পানিগুলো সরাসরি ঢাকার আড়তগুলোতে সরকারের বেধে দেওয়া দামে ডিম সরবরাহ করছে। কার্যত, এতেই ঘুরে গেছে বাজারের চেহারা। তবে ঢাকার বাইরে কিছু এলাকা বাদে এর প্রভাব পড়েনি বলে জানা গেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর জিগাতলা এলাকা থেকে ১৫০ টাকা ডজনে ডিম কিনেছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এতদিন ১৮০ টাকা ডজনে ডিম কিনতে হয়েছে। প্রতিটি ডিমের দাম পড়ত ১৫ টাকা। সেই ডিম কিনলাম সাড়ে ১২ টাকা করে।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাজারগুলোয় প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হয়েছিল ১৮০ টাকায়। দুয়েকটি জায়গায় আবার ১৯০ টাকায় বিক্রি হতেও দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার কোথাও কোথাও তা কমে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা ডজনে নেমে আসে। গতকাল বাজারভেদে সেই ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা ডজনে।
যা জানালেন ব্যবসায়ীরা
ডিমের দাম কীভাবে কমছে জানতে চাইলে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ আমানউল্লাহ গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, করপোরেট কোম্পানিগুলো বৃহস্পতিবার রাত থেকে সরকারি মূল্যে ডিম বিক্রি করছে। এতে করে মাঝখানে যে হাতবদল হতো তা কমে গেছে। তাতে করে ডিমের দামও কমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তা অধিদপ্তর কয়েকদিন আগে প্রতিটি ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেয়। তখন বলা হয়েছে, যদি কোম্পানিগুলো সরাসরি তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে ডিম সরবরাহ করে তাহলে ১০ টাকা ৯১ পয়সায় বিক্রি করবে। আর যদি তাদের খামার থেকে আড়তদাররা কিনে আনেন তাহলে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা দাম দেবে। সে ক্ষেত্রে এক হালির দাম হয় ৪২ টাকা ৩২ পয়সা, এক ডজন ১২৬ দশমিক ৯৬ টাকা ও ১০০ ডিমের দাম পড়ে ১ হাজার ৫৮ পয়সা। আর প্রতিটি ডিম ১০ টাকা ৯১ পয়সায় বিক্রি হলে প্রতি হালির দাম পড়ে ৪৩ টাকা ৬৪ পয়সা, ডজনে ১৩০ দশমিক ৯২ টাকা এবং একশ ডিমে ১ হাজার ৯১ টাকা। আমরা একশ ডিমে ৩০ টাকা লাভ করে থাকি। সেখানে আমাদের খরচ আছে ২০ থেকে ২২ টাকা।
মোহাম্মদ আমানউল্লাহ বলেন, এখন থেকে তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে প্রতিটিতে ১০ লাখ করে মোট ২০ লাখ ডিম সরবরাহ করবে এসব কোম্পানি। যদি তাদের সরবরাহ অব্যাহত থাকে তাহলে ডিমের বাজারও স্থিতিশীল থাকবে।
তিনি জানান, বেশিরভাগ ডিম আসে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ থেকে। টাঙ্গাইল থেকেই ৬০ ভাগের বেশি ডিম ঢাকায় আসে। সেখানে ৪ থেকে ৫ বার হাতবদল হয়। এতে ডিমের দাম ক্রমেই বেড়ে যায়।
তেজগাঁও বাজারের বিল্লাল ট্রেডার্সের রুবেল মিয়া বলেন, এই বাজারে দৈনিক ২০ থেকে ২২ লাখ ডিম বিক্রি হয়। বৃহস্পতিবার রাতে ২৫ লাখ ডিম ঢুকেছে। এতে দামও অনেক কমে এসেছে। তিনি জানান, কাপ্তান বাজারে দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ লাখ ডিম বিক্রি হয়। সেখানেও যদি সরবরাহ ঠিক থাকে তাহলে ঢাকার বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
সরাসরি ডিম বিক্রি করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো
বৃহস্পতিবার রাত থেকে রাজধানীর ডিমের বৃহৎ পাইকারি আড়ত তেজগাঁওয়ে উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সরকারের নির্ধারণ করা যৌক্তিক মূল্যে ডিম বিক্রি শুরু হয়। উৎপাদক থেকে সরাসরি ডিলার পর্যায়ে ডিম বিক্রির কার্যক্রমটি উদ্বোধন করেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) ডা. এবিএম খালেদুজ্জামান, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান, কাজী ফার্মের পরিচালক কাজী জিসান, তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি হাজী মো. আমানুল্লাহ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডিমের দাম কমে এসেছে। এতে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। আমরা চাই এটি অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার কোম্পানিগুলো তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে সরাসরি ৩০ লাখ ডিম দিয়েছে। শুক্রবার দিয়েছে ১০ লাখ। শনিবার থেকে দুই বাজারে প্রতিদিন ২০ লাখ ডিম সরবরাহ করবে।
রাজধানীর বাইরের চিত্র
রাজধানীতে ডিমের দাম কমলেও দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরে ডিমের দাম খুব একটা কমেনি। হাতে গোনা কয়েকটি স্থান ছাড়া ৫৫ থেকে ৬০ টাকা হালিতে ডিম বিক্রি হচ্ছে। বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ে ডিমের দাম না কমার বিষয়ে ভোক্তার মহাপরিচালক বলেন, কোথাও কোথাও কমতে শুরু করেছে। আমার কাছে কয়েকটি বিভাগের তথ্য রয়েছে। আশা করি, কয়েকদিনের মধ্যে সবখানেই কমে আসবে।
মাদারীপুর প্রতিবেদক জানান, সরকার নির্ধারিত দামে কেনাবেচা করে লোকসান গোনার ভয়ে তিন দিন ধরে ডিম সংগ্রহ করা বন্ধ রেখেছে এই অঞ্চলের আড়তদাররা। গত বুধবার থেকে তারা দেশের কোনো খামারির কাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করতে যাননি। বাজারে আড়ত বন্ধ থাকায় ডিম না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন খুচরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
ডিম ব্যবসায়ী মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে একটা দাম বেধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা সেই দামে ডিম কিনতে পারছি না। এই পরিস্থিতিতে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা গাড়ি বন্ধ করে রেখেছি। কিন্তু এভাবে কতদিন? ডিম কেনা-বেচা করাই আমাদের পেশা। প্রান্তিক পর্যায়ে ডিমের যে দাম, তাতে ডিম ক্রয় করলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে। আমরা পথে বসে যাব।
তার দাবি, খামারিদের কাছ থেকে পাইকারি দরে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছে ১২ টাকার বেশি। তার সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ করতে হচ্ছে। এতে এক ট্রাক ডিম মাদারীপুরের আড়তে আনতে প্রতি পিস ডিমের দাম পড়ে প্রায় ১৩ টাকা। ফলে সরকারের নির্ধারিত দামে ডিম কেনাবেচা করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে আরও দেখা যায়, সিলেটে গত এক সপ্তাহ যাবৎ ৬০ টাকা হালিতে ডিম বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা হালিতে। রাজশাহীতে পাইকারিভাবে ডিমের হালি ৪৮ টাকা ও বড় আকারের ডিম ৫৬ টাকা। আর খুচরা পর্যায়ে ছোট সাইজ ৫২ থেকে ৫৪ টাকা ও বড় সাইজ ৬০ টাকা। খুলনা সদরে আকারভেদে পাইকারি পর্যায়ে ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা হালি। খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায়। খুলনায় মূলত ভারত থেকে ডিম আমদানির কারণে দাম কিছু কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আবার রংপুরে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৪ টাকায় ও খুচরায় ৫৬ থেকে ৫৮ টাকায়। ময়মনসিংহে গত ৪ দিন যাবৎ খুচরা পর্যায়ে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। আর পাইকারিভাবে ৫৩ থেকে ৫৪ টাকায়। বরিশালে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। গতকাল সেখানে প্রতি হালি ডিম পাইকারি পর্যায়ে ৫০ টাকা ও খুচরায় ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রামে গত দুই দিনে পাইকারিতে প্রতিটি ডিমের দাম ৭০ থেকে ৮০ পয়সা করে কমেছে। বৃহস্পতিবার যেখানে প্রতি পিস ডিম পাইকারিতে ৪৮ টাকা হালিতে বিক্রি হয়েছে ও গতকাল বিক্রি হয়েছে ৪৪ টাকা ৮০ পয়সায়। পাইকারিতে দাম কমায় খুচরায়ও দাম কমছ। ডজন প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা দাম কমেছে। গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়।
ডিম আমদানিতে শুল্ক কমেছে ২০ শতাংশ
বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ডিমের ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এতে আমদানি পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৩ টাকা ৮০ পয়সা কমবে।
দুই প্রতিষ্ঠানকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা
গতকাল ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাহমিনা আক্তার রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া কাঁচাবাজার ও তালতলা কাঁচাবাজারে অভিযান চালান। তিনি জানান, ডিমের দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি রয়েছে।
অভিযানকালে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি করায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তার মধ্যে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বিসমিল্লাহ স্টোরে অভিযান চালান ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল। এ সময় খুচরা বিক্রয় মূল্য ১১ টাকা ৮৭ পয়সার পরিবর্তে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায় প্রতিটি ডিম বিক্রির প্রমাণ পান তিনি। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে আদাবর থানার বাইতুল আমান হাউজিং এলাকায় আলবানিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের ডিম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ডিম ক্রয়ের পাকা ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ না করা, ডিম বিক্রয়ের ক্যাশ মেমোতে কার্বন কপি না থাকা ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।