ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৪ ০৯:১৩ এএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪ ১৬:০২ পিএম
ঈদুল আজহার আগে এক কেজি নাজিরশাইল চালের দাম ছিল ৭০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকায়। জানালেন রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার নাখালপাড়ার মুদি দোকানি মো. মফিজুল ইসলাম। গত রবিবার তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথোপকথনে আরও জানান, এমবি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকায়। যার দাম ছিল ঈদের আগে ৫২ টাকা। আকিজ কোম্পানির মিনিকেট কেজিপ্রতি সাড়ে ৬৬ টাকা।
শুধু নাখালপাড়ায় নয়। গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রায় সব রকম চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ বোরো মৌসুমে চলতি বছর চাহিদার চেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। যদিও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের সময় মিল বন্ধ থাকায় এই মূল্যবৃদ্ধি; খুচরা ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে।
বিভিন্ন বাজারের চিত্র বনাম সরকারি তথ্য
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা হচ্ছিল মহাখালী কাঁচাবাজারের চাল ব্যবসায়ী মো. মানিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ব্রি-২৯ চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০-৫২ টাকায়। ঈদের আগে ছিল ৪৮-৫০ টাকা। এছাড়া ব্রি-২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৩ টাকা, মিনিকেট ৬৫-৬৮ এবং আমন (লাল চাল) চাল ৬৫ টাকা।’ তার মতে, ‘চাল আমদানিতে খরচ কিছুটা বেড়েছে। যারা নতুন চাল দোকানে তুলেছেন, তাদের বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার যাদের আগের চালের মজুদ ছিল, তারা কম দামেই বিক্রি করছেন।’ তিনিও জানান, মিল চালু হতে কয়েকদিন দেরি হওয়ায় চালের দাম ‘সামান্য’ বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
একই বাজারের অপর ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘সরকার নতুন নিয়ম করেছেÑ মিলগেটে বস্তায় চালের দাম লিখতে হবে। এটি নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়ছি। কেননা মিলগেটে চালের বস্তায় যে দাম লেখা থাকছে, সে অনুযায়ী আড়তদাররা দাম রাখছেন না। তাদেরকে বাড়তি দিতে হচ্ছে। এজন্য মিলগেট ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দুটির বিষয়েই নির্দেশনা দেওয়া দরকার।’
অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে গত রবিবার দেখা যায়, বর্তমানে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, বিআর-২৩ চালের দাম পাইকারি পর্যায়ে ৪৮ থেকে ৫৪ ও খুচরায় ৫২ থেকে ৫৮ টাকা।
চালের মূল্যবৃদ্ধি : সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বোরো মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হলেও চালের দাম বাড়ছে কেন?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘ধান কাটার পর থেকেই বিক্রি শুরু হয়। অনেকে ক্ষেত থেকেই ধান বিক্রি করে দেন। এসব ধান ফড়িয়া হয়ে করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। সব না হলেও বেশিরভাগ ধানই এর মধ্যে করপোরেট গোষ্ঠীর গুদামে উঠেছে। তারা ইচ্ছা অনুযায়ী দাম বাড়ায়, আবার ইচ্ছা হলে কমিয়ে থাকে।’
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে সরকারের কাছে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৮ টন চাল মজুদ রয়েছে। গম মজুদ আছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৫৬ লাখ টন।’
বর্তমান অবস্থায় চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত শনিবার আমাদের জেলা খাদ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধির কারণ খোঁজা হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। যাতে বাজারদর স্থিতিশীল থাকে। যেক্ষেত্রে জেলাপর্যায়ে সমাধান করা যাবে না, সেক্ষেত্রে অধিদপ্তর থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মিলগেট ও আড়তপর্যায়ে দামের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘চালের বস্তা কোন স্থান থেকে কত দূরে কোন স্থানে যাবে, সে অনুযায়ী খুচরা দাম নির্ধারণ করা হবে। মিলগেটে তাদের উৎপাদনের ব্যয়টা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে করে অভিযানের সময় বোঝা যাবে বিক্রেতারা দাম কতটা বেশি নিচ্ছেন।’
এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কেননা ঈদের সময় অনেক মিল বন্ধ ছিল। সেগুলো এখনও চালু হয়নি। অনেক মিলের কর্মচারীরা আবার কাজে ফেরেনি।’ তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে মিলগেটে স্বর্ণা বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫২ টাকা কেজি। বর্তমানে এর দাম ৫০ থেকে ৫৪ টাকা। মিনিকেট ছিল ৫৫-৬০ টাকা, বর্তমানে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। তাছাড়া ব্রি-২৮ চাল ৫৬-৫৭ টাকা, জিরাশাইল (নাজিরশাইল) ৬২-৬৩ ও কাটারিভোগ ৬১-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চালের দাম হয়তো আর বাড়বে না। কারণ মিলগুলো পুরোপুরি চালু হলে আমদানি-রপ্তানি বেড়ে যাবে।’
উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ২৮৪ লাখ মেট্রিক টন
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২২২ দশমিক ৬৬৪ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে উৎপাদন হয়েছে ২২৩ দশমিক ৯৪৮ লাখ টন। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ২৮৪ লাখ টন।
এ বছর কী পরিমাণ জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. তাজুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ দশমিক ৫৮১ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। তার মধ্যে হাইব্রিডের জন্য জমি ছিল ১৪ দশমিক ৭৬৪ লাখ হেক্টর, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ৭৩ দশমিক ৬২৮ লাখ মে টন। উফশী ছিল ৩৫ দশমিক ৬৭১ লাখ হেক্টর জমিতে, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ১৫০ দশমিক ০৪২ লাখ মে টন। স্থানীয় শূন্য দশমিক ১৫৯ লাখ হেক্টর জমি, সেখানে উৎপাদন হয়েছে শূন্য দশমিক ২৭৮ লাখ মে টন। হাইব্রিডে গড় ফলন ৪ দশমিক ৯৯ ও কর্তনের হার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। উফশীতে গড় ফলন ৪ দশমিক ২১ ও কর্তনের হার ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। স্থানীয় জাতের গড় ফলন ১ দশমিক ৯১ ও কর্তনের হার ১০০ শতাংশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ফুড আউটলুক ২০২৪-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫-এ বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। এফএও জানাচ্ছে, বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ২০২৩-২৪ সালের ৩ কোটি ৯০ লাখ টন থেকে ২০২৪-২৫ সালে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। চলতি বছর শূন্য দশমিক ৪ মিলিয়ন টন চাল আমদানি করতে হতে পারে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে বাড়ছে না চালের উৎপাদন
এদিকে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় চালের উৎপাদন বাড়ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনই একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘প্রধান খাদ্যশস্য তথা চাল উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে সম্প্রতি অনেকটা ভাটা পড়েছে। চাল হিসেবে ২০১৯-২০ সালে মোট উৎপাদন ছিল ৩৮৬ দশমিক ৯৫ লাখ টন। ২০২০-২১ সালে ছিল ৩৭৬ দশমিক ৮ লাখ টন। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২১-২২ সালে মোট চাল উৎপাদন ছিল ৩৯১ দশমিক ৮ লাখ টন। প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে ছিল ৩৯০ লাখ টন। প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত ৩ বছরে চাল উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ আর জনসংখ্যার গড় প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, গত ৩ বছরে চালের উৎপাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে পারেনি। ধান উৎপাদনে হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে খাদ্য সংকট কিছুটা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘উৎপাদনের হার প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে চালের দাম বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে চাল আমদানি করতে হবে।’ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি হওয়ায় আমদানি করে স্থানীয় চাহিদা মেটানো কঠিনÑ এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৬-৩৭ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৩ কোটি টন মানুষের ব্যবহারের জন্য এবং বীজ, খাদ্য, অপচয় ও প্রক্রিয়াজাত করতে ৬-৭ মিলিয়ন টন প্রয়োজন।’
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম
এদিকে চলতি বছর জার্মানির বন থেকে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ জানাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের প্রথম সারির খাদ্য নিরাপত্তাহীন ১০টি দেশের মধ্যে অষ্টম। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক সংঘাত ও আবহাওয়ার বৈপরীত্যের কারণে আগামী দিনগুলোতে কৃষির উৎপাদন কমবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি আউটলুক প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, এর ফলে খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়বে। তাতে দুর্ভোগ বাড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের।
আউটলুকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪-২৫ সালে বিশ্বব্যাপী চাল উৎপাদন শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৫৩৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন টনে পৌঁছবে। তাদের হিসাবে বর্তমানে বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ টানা সপ্তমবারের মতো তৃতীয়, ভারত দ্বিতীয় ও চীন প্রথম স্থানে রয়েছে।