প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৪ ১০:০৮ এএম
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪ ১৭:৫৪ পিএম
নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে হাটের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকাগুলোতেও। প্রবা ফটো
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে এবার রাজধানীতে ১৯টি অস্থায়ী পশুর হাট বসিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর কথা থাকলেও বেশিরভাগ হাটে আগেভাগেই পশু নিয়ে জড়ো হয়েছেন ব্যাপারিরা। বিক্রি শুরু না হলেও গতকাল বুধবারও হাটগুলোতে দর্শনার্থীর ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। শুক্র-শনিবার থেকে পশু বিক্রি জমে উঠবে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, শুরুর আগেই নিয়ম অমান্য করছে হাট কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে হাটের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকাগুলোতেও।
গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ধোলাইখাল ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটটি পশুতে ভরে উঠেছে। হাটের মূল জায়গা ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। এই হাটের চৌহদ্দি ট্রাকস্ট্যান্ডের আশপাশের এলাকায় করার কথা থাকলেও রায়সাহেব বাজার থেকে দয়াগঞ্জ মীরহাজারীবাগ, মুরগীটোলা থেকে লোহারপুল, ধুপখোলা মাঠের আশপাশের গলি আর ওয়ারীর টিপু সুলতান রোড পর্যন্ত সড়কে বিস্তৃত হয়ে গেছে। হাটের চার পাশের সড়ক দিয়েই ট্রাকে ট্রাকে আসছে গরু। মাইক থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে পশু বিক্রির পরে কেউ যেন রসিদ ছাড়া না যায়।
এ হাটের ইজারাদার প্রতিনিধি শামীম আকতার বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে পশু আসা শেষ। হাটের প্রস্তুতিও শেষ করেছি। বৃহস্পতিবার সরকারি অফিসের শেষ দিন। অফিস ছুটির পরে রাত থেকেই ক্রেতারা হাটে আসা শুরু করবেন।
ধুপখোলা ট্রাকস্ট্যান্ডের পাশেই পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পশুর হাট। এই হাটটিও বুড়িগঙ্গার বেড়িবাঁধের চৌহদ্দি পার হয়ে আশপাশের গলিতে ঢুকে গেছে। সড়কের দুই পাশে সারি করে গরু রাখায় সড়ক বন্ধ হলেও এখনও ট্রলারে ট্রলারে আসছে গরু। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে শ্যামপুর হাটেরও একই অবস্থা। মহাসড়কে এর মধ্যেই হাট বসে গেছে। দনিয়া কলেজ সংলগ্ন হাটটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশের চার সারি করে আশপাশের গলির মধ্যেও ঢুকে গেছে।
দনিয়া পশুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আযহার মাহমুদ বলেন, এবার খরচা বেশি। আপাতত ৪টি গরু এনেছি। দাম সাড়ে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। একেকটা গরু রাখা বাবদ দিতে হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। এর বাইরে গরু আনা, গরু ও নিজের খাবার খরচ, রাখাল খরচ, সব মিলে লাখ টাকা বিক্রির আগেই চলে গেছে।
এদিকে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের নানান প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে গরু আসছে গাবতলীতে। এখনও বেচাকেনা সেভাবে শুরু না হলেও বেশ আয়েশ করে চলছে দরকষাকষি।
ক্রেতাদের অভিযোগ, আকাশচুম্বী দাম চাচ্ছেন ব্যাপারিরা। এর ফলে দরকষাকষি বেশি হচ্ছে। এবার হাটে ৮০ হাজার টাকার কমে কোনো গরু মিলছে না। আর ব্যাপারিদের দাবি, গরুর খরচের বিষয়ে ক্রেতাদের কোনো ধারণা নেই। যে কারণে গরুর দাম কম বলছেন তারা।
গতকাল গাবতলী হাটের প্রবেশমুখেই দেখা যায় হাসিলের জন্য বাঁধা রয়েছে একটি গরু। দুই মণ মাংস হবে না এমন আকারের গরুটি বিক্রি হয়েছে ৮১ হাজার টাকায়। কালো-সাদা রঙের সংকর জাতের মাঝারি আকারের একটি গরু ১ লাখ ১ হাজার টাকায় কিনেছেন সাভারের আরেফিন সাঈদ। ব্যাপারিরা চার মণ মাংস হবে বললেও গরুতে থেকে তিন মণ মাংস মেলা ভার। হাটে গরুর দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ সাঈদের।
ব্যবসায়ীরা বলছেন অন্য কথা। ঢাকায় এনে গরু বিক্রি করে যে দাম পেয়েছেন তাতে খুশি নন কুষ্টিয়ার সিদ্দিক ব্যাপারি। দেশি জাতের এক জোড়া গরু বিক্রি করেছেন দুই লাখ ৩০ হাজার টাকায়। তার দাবি, গরু দুটি থেকে ৮ মণ মাংস মিলবে। গাবতলী হাটে না এসে গ্রামের হাটে বিক্রি করলে আরও ভালো দাম পেতেন বলে মনে করেন তিনি। দাম বেশি চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সিদ্দিক বলেন, ‘ক্রেতারা আমাদের মনের কষ্ট বোঝে না। গরু পালন করতে কত খরচ হয় এটাও ক্রেতারা জানে না। গরুর খাবারের দাম বেশি, শ্রমিক রাখলে তাদের বেতনও বেশি। গরুপ্রতি দিনে খরচ হাজার-বারোশ টাকা। তাহলে মাসে খরচ কত আপনারাই বলেন! এ ছাড়া বিদ্যুৎ, সাবান, শ্যাম্পু, মশার কয়েলের খরচ আছে।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে কোরবানির পশু সাধারণত ঈদের এক থেকে দুই দিন আগে বেশি বিক্রি হয়। এখন যেসব গরু বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ ক্রেতাই ঢাকার আশপাশের এলাকার, বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, সাভারের। যাদের বাড়িতে খোলামেলা খালি জায়গা পড়ে আছে, তারাই মূলত গরু কিনছেন এখন। এ ছাড়া বেশিরভাগ ক্রেতা এখন হাটে আসছেন গরুর দাম জানতে। এখনও কেনার প্রতি ততটা আগ্রহী নন কেউ। এবার দেশি জাতের মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি বলে জানান ব্যাপারীরা।
হাটে গরুর দাম চড়া হলেও কোরবানির ঈদ উপলক্ষে দেশে গরু-ছাগলের ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে পশুর কোনো ঘাটতি না থাকায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এবার কোরবানির ঈদ ভালোভাবে করতে পারবেন। গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ গবাদিপশু অবিক্রীত ছিল। এ বছর তার সঙ্গে আরও সাড়ে চার লাখ পশু যোগ হয়েছে। আমাদের দেশে চাহিদা এক কোটি ২৯ লাখ পশু, সেখানে আছে এক কোটি ৩০ লাখেরও বেশি।’