বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ ২২:০৪ পিএম
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:৫২ পিএম
সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও সাহিত্য সম্মাননা-২০২৪ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কবি ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ’র সম্পাদক মুস্তাফিজ শফীসহ অতিথিরা। প্রবা ফটো
কথাসাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি সেলিনা হোসেন বলেছেন, বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার। এটি মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছিল। বাংলা ভাষা সেদিন উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছিল। তবে তখনও আমাদের সাহিত্য বিদেশিদের কাছে পৌঁছেনি। যদিও আমাদের সাহিত্যের অন্যতম এক অধ্যায় পেরিয়ে গিয়েছিল পঞ্চাশের দশকে, যখন কবি আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমানের মতো সাহিত্যিকরা লেখালেখি করছিলেন। বিদেশিরা আমাদের সাহিত্য অনুবাদ করে তাদেরকে দিতে অনুরোধ করেন। যাতে তারাও জানতে পারে কোন ভাষা এবং দেশের জন্য কারা নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়েছিল।
শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁও গ্রন্থাগার মিলনায়তনে সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও সাহিত্য সম্মাননা-২০২৪ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সেলিনা হোসেন।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমাদের বহু সাহিত্য রচিত হয়েছে। এতদিনে বিশ্ব-অঙ্গনে বাংলাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিশাল সুযোগ ছিলÑ যদি এসব সাহিত্যের ভালো অনুবাদ করা যেত। এজন্য সরকারের অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রয়োজন। ১৯৭০ সাল থেকে আমি বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত। তখন থেকে এ পর্যন্ত কোনো সরকারই এ ব্যাপারটা সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। তাই কবিতা, গল্প, সাহিত্য, উপন্যাস অসংখ্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করতে পারিনি। এ জায়গাটা নিয়ে আমরা কাজ করার সুযোগ পেলে দেশীয় শিল্প-সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ এবং সম্প্রসারণ করতে পারব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ কবি ও নাট্য পরিচালক এমি নেইলসন স্মিথ ও যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় ধ্রুপদী শিল্পের শীর্ষস্থানীয় সংস্থা সৌধের পরিচালক কবি টি এম আহমেদ কায়সার। বাংলা একাডেমির সভাপতি সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক সালমা বাণী, কবি ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, কবি ও সাহিত্যিক অধ্যাপক শামীম রেজা, অনুবাদক ড. সুরাইয়া ফারজানা হাসান, সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি সৈয়দ আনোয়ার রেজা, কবি নাসির আহমেদ, পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ফখরুল হাসান প্রমুখ।
কবি আবুল হাসানের কবিতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর ‘আমার লেখা আমার সাহিত্য দর্শন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিকরা।
কবি ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, প্রবাসে থেকেও যারা বাংলা সাহিত্য চর্চা করেন, তারা মূলত দেশকে অন্তরে ধারণ করেন। এপার-ওপার বাংলার পর ইংল্যান্ডপ্রবাসী সাহিত্যিকরা সে দেশকে বলেন তৃতীয় বাংলা। তারা সাহিত্য অঙ্গনে আন্তর্জাতিক মেলবন্ধনের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। যাতে আমাদের লেখাগুলো তাদের কাছে পৌঁছে এবং তাদের লেখাগুলোও সেভাবে আমাদের কাছে আসে। সে লক্ষ্যে আমি নিজেও কাজ করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশীয় বিভিন্ন সাহিত্যানুষ্ঠানে এখন কিছু বিদেশি লেখকের উপস্থিতি দেখা গেলেও রবীন্দ্রনাথের আগে আমাদের লেখাগুলো তাদের কাছে পরিচিত ছিল না। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রমণ করে তার সাহিত্য ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, সেদিক বিবেচনায় লালন কিন্তু সেই সুযোগ পাননি। তবে অক্সফোর্ডে এক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে লালন এবং হাছন রাজা সম্পর্কে প্রথম কথা বলেন কবিগুরু। তারপর তারা কিছুটা পরিচিতি পেয়েছিলেন। একইভাবে শাহ আবদুল করিম লম্বা জীবৎকাল পেয়েও তার লেখালেখির সোনালি সময়টায় খুব বেশি পরিচিতি পাননি। এখন যারা লেখালেখি করছেন, তাদের সঙ্গে যাতে এমনটা না হয়, সেটি নিয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে।’
কবি মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনেক বড় কবি। তবে আমরা তার অল্প কিছু লেখা পড়ে পাঠ্যপুস্তকেই কবিকে হারিয়ে ফেলেছি। জীবনানন্দ দাশের কবিতা বিশ্বের বড় বড় কবিদের চাইতেও উচ্চমানের। এগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাই এদেশের এবং বাইরের কবি-লেখকদের লেখা আদান-প্রদান জরুরি, যার মিথস্ক্রিয়ায় আরও মহৎ সাহিত্যের সৃষ্টি হবে।’
কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক টি এম আহমেদ কায়সার বলেন, যখন দেশে সাহিত্য নিয়ে কাজ করেছি, তখন মনে হয়েছিল আমরা নিজেরাই শুধু নিজেদের লেখাগুলো পড়ছি। এখন অনেক অবাঙালি বাংলায় সাহিত্য চর্চা করছেন। তারা তাদের কাজের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছেন আমাদের কথা ও কালচার। এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন এবং সম্মানের ব্যাপার।
কবি নাসির আহমেদ বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের মাথার ওপরে সূর্য, কবি নজরুলও তাই। তবে এরা আমাদের লেখার জন্য প্রভাবিত করেননি। আধুনিক কবি শামসুর রাহমান, জীবনানন্দ দাশ এরাই আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাদের লেখাগুলো না পড়লে কেউ কবিতা লিখতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলা সাহিত্যে অনেক পুরস্কার আছে, তবে সবগুলো এক মানের না। কিছু পুরস্কার নিলে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদাহানি হবে। পুরস্কার হতে হবে এমন যেটার জন্য মানুষ আকুল হবে। যে আটজন পুরস্কার পাচ্ছেন, তারা যোগ্য ও গুণী।
আয়োজকদের দাবি, গত সাত বছরে যাদেরকে এ পরিষদ থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছে, তাদের ১৫ জনই বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন।
এবার ২০২৩ সাল বিবেচনায় কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য যৌথভাবে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এবং মজিবুল হক কবীর, কথাসাহিত্যে আকমল হোসেন নিপু, প্রবন্ধে গাজী আজিজুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় সিরু বাঙালি, শিশুসাহিত্যে জাকির হোসেন কামাল মনোনীত হয়েছেন। পাশাপাশি সাহিত্যের আরও দুটি শাখায় অর্থাৎ ছোটগল্পে জয়শ্রী দাস এবং শিশুসাহিত্যে মরণোত্তর সম্মাননা পেয়েছেন রাইদাহ গালিবা।