চিত্রকর্ম প্রদর্শনী
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৬:০০ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৬:২৮ পিএম
আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী অর্চিতা সাহা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে সাধারণত প্রতিযোগিতার নিয়ম থাকে অত্যন্ত কঠোর। সেখানে অংশ নিতে প্রয়োজন হয় নিবন্ধন ফি, আনুষ্ঠানিকতা এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত পূরণের।
কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে শুধু শিল্পগুণের জোরে ইতিহাস গড়লেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী অর্চিতা সাহা।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার নোমা গ্যালারিতে আয়োজিত ‘মিথ অ্যান্ড লেজেন্ড’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিতে গিয়ে পেমেন্ট জটিলতায় পড়েন অর্চিতা। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সমস্যার কারণে বারবার তার নিবন্ধন ফি বাতিল হয়ে যাচ্ছিল।
‘ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিবন্ধন ফি মওকুফ’
গ্যালারি কর্তৃপক্ষ শুরুতে জানিয়ে দেয়, ফি জমা না হলে তার চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর জন্য বিবেচিত হবে না। এতে প্রায় আশাহীন হয়ে পড়েন অর্চিতা।
পরে তার ‘রূপান্তর’ শীর্ষক চিত্রকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়ে নোমা গ্যালারির জুরি বোর্ড ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো শিল্পীর নিবন্ধন ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়।
অর্চিতা সাহা বলেন, আমি প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বুঝি পেমেন্ট জটিলতার কাছেই থেমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, জুরি বোর্ড আমার কাজ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে তারা আমাকে মেইল করে জানায়, তোমার কাজ আমরা হারাতে চাই না, এটি বিনামূল্যেই প্রদর্শিত হবে। তখন মনে হয়েছিল শিল্পের সত্যিই কোনো সীমানা নেই।
নিয়ম ভেঙে প্রদর্শনীতে জায়গা পাওয়া সেই ‘রূপান্তর’ চিত্রকর্মই পরে ১ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলা প্রদর্শনীতে দর্শক ও সমালোচকদের মন জয় করে নেয়।
৩৫টি দেশের শিল্পীদের পেছনে ফেলে ছবিটি জিতে নেয় শ্রেষ্ঠ ‘পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’।
ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে পান বিজয়ের ইমেইল
অর্চিতা জানান, ‘দ্য ট্রান্সফরমেশন ফ্রম রয়্যালিটি টু রিনানসিয়েশন’ নামের এই চিত্রকর্মটি মাত্র দুই দিন ও দুই রাতের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে তৈরি করেন তিনি। জলরঙে হ্যান্ডমেইড কাগজে আকা ছবিটিতে গৌতম বুদ্ধের জীবনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চিত্রকর্মের ভাবনা সম্পর্কে অর্চিতা বলেন, সিদ্ধার্থের রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে বুদ্ধ হয়ে ওঠার বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। সেই রূপান্তরের গল্পটাই একই ফ্রেমে তুলে ধরতে চেয়েছি।
তিনি জানান, ছবির এক পাশে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের আভিজাত্য বোঝাতে গ্লিটার ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য পাশে ত্যাগী বুদ্ধের প্রতিচ্ছবি আঁকা হয়েছে। তীর-ধনুক ও ধর্মচক্রের প্রতীক দিয়ে পরিবর্তনের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গত ২৫ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে নোমা গ্যালারি থেকে বিজয়ের ইমেইল পান অর্চিতা।
সেই মুহূর্তের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পরীক্ষার হলের নীরবতার মাঝে হঠাৎ মেইলটি দেখে আমার হাত কাঁপছিল। আমি বারবার মেইলটি পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, এটা কীভাবে সম্ভব!”
সে সময় নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না উল্লেখ করে অর্চিতা বলেন, “৩৫টি দেশের এত বড় বড় শিল্পীদের পেছনে ফেলে আমি প্রথম হয়েছি?
“আমার ঘোর কাটছিল না দেখে পাশে থাকা শিক্ষককে মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললাম—স্যার একটু দেখুন তো, আমি ঠিক দেখছি কি না?”
অর্চিতা জানান, “স্যার যখন হেসে আমাকে নিশ্চিত করলেন, তখন ল্যাব কক্ষেই এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো।
ওখান থেকেই প্রথম ফোনটা করি মাকে, মা তো কেঁদেই দিলেন। এরপর আমার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সবাইকে জানাই।”
শৈশবে স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি
অর্চিতা বলেন, শৈশবে স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এমনকি ছোটবেলায় লোকনাথ ব্রহ্মচারীর একটি ছবি এঁকে প্রথমবার নিজের প্রতিভা দিয়ে পরিবারকে চমকে দেন তিনি।
এইচএসসি শেষে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। তবে শুরুটা সহজ ছিল না বলে জানান তিনি।
অর্চিতা বলেন, প্রথমদিকে আমি পেশাদার আঁকার কিছুই জানতাম না। সহপাঠীদের তুলনায় কম নম্বর পেতাম। কিন্তু হাল ছাড়িনি। নিজের সীমাবদ্ধতা ভেঙে দিন-রাত পরিশ্রম করেছি।
তার সেই পরিশ্রমের ফলও পেয়েছেন। স্নাতকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবার ও স্বামীর অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন অর্চিতা।
তিনি বলেন, আমার স্বামীই আমার সবচেয়ে বড় সমালোচক ও পরামর্শদাতা। কাজের ভুলগুলো তিনিই ধরিয়ে দিতেন।
নতুন শিল্পীদের উদ্দেশে অর্চিতা বলেন, সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। পুরস্কারের জন্য নয়, নিজের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে শিল্পচর্চা করতে হবে।
অর্চিতার এই অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সভাপতি ড. মো. বনি আদম।
তিনি বলেন, অর্চিতার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের বিভাগের জন্য অত্যন্ত গর্বের। এটি প্রমাণ করে আমাদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিশ্বমানের।
বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের এই যাত্রার পর এখন বাংলার শিল্পকলাকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখছেন অর্চিতা সাহা।