আজ ১৬৫তম রবীন্দ্রজয়ন্তী
ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখায় রবীন্দ্রনাথ হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’Ñ নিজের এক জন্মদিনে এমনটিই লিখেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
যিনি তার জীবন ও সৃষ্টিকর্ম দিয়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
তার প্রত্যাশা ছিল, বারবার যেন ফিরে আসে জন্মের সেই ক্ষণ, তার আলোয় তিনি যেন হয়ে ওঠেন ‘চির-নূতন’। পঁচিশে বৈশাখ, কবির এই জন্মদিন তাই অবিরাম ডেকে চলে চির-নতুনকে।
অন্য এক কবিতায়ও লিখেছেন তিনি, ‘জন্মদিন আসে বারে বারে/ মনে করাবারেÑ/ এ জীবন নিত্যই নূতন/ প্রতি প্রাতে আলোকিত/ পুলকিত দিনের মতন।’
‘নিত্যই নূতন’ জীবন নিয়ে তার সেই জন্মদিন আজ আবারও দেখা দিয়েছে পৃথিবীর বুকে; উদযাপন হতে চলেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী।
বাংলাদেশ ও বাঙালির জীবনযাপন ও সংস্কৃতিচর্চায়, এ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিকতা ও সৃজনযজ্ঞে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা ও প্রভাব এত গভীর যে ১৫০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার জন্মদিন আমাদের কাছে দেখা দেয় আনন্দের উৎস হয়ে।
১২৬৮ সনের এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারেÑ বাঙালি সমাজে যে পরিবার নিয়ে এসেছিল পরিবর্তনের স্রোত।
এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে এই পরিবার সূচনা করেছিল নতুন এক স্রোতপ্রবাহের।
তার মা সারদাসুন্দরী দেবী, বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাদের চতুর্দশ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালক্রমে হয়ে ওঠেন এক আলোকবর্তিকা।
রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন যে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন, ঠাকুর পরিবার ছিল সেই আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী।
তাদের ওই আন্দোলনের ফলে বাংলায় একেশ্বরবাদের প্রচার গতি পায় বিশেষত মধ্যবিত্ত সমাজে; মূর্তিপূজা বর্জন, বর্ণপ্রথা উচ্ছেদ আর নারীদের শিক্ষা ও বিধবাবিবাহের পক্ষে এবং সহমরণ প্রথার বিপক্ষে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে ঠাকুর পরিবার।
রবীন্দ্রনাথও ছিলেন এই ব্রাহ্মসমাজের সহযাত্রী।
বিশেষত ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়।
১৯১৩ সালে তিনি তার ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থের জন্য অর্জন করেন নোবেল পুরস্কার। সেই সূত্রে বিশ্বসাহিত্য ও ভাষার প্রান্তরে নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত হয় বাংলা ভাষা-সাহিত্য।
স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনি রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’সহ একাধিক আবেগজাগানিয়া দেশাত্মবোধক গান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ‘আমার সোনার বাংলা’ ছিল প্রবল অনুপ্রেরণাময় এক সংগীতÑ যা পরে স্বীকৃতি পেয়েছে এদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে।
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরে সংঘটিত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশরাজের দেওয়া নাইট উপাধি বর্জন করেন।
বাংলাসহ গোটা ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার শুভবোধ থেকে তিনি প্রচলন ঘটান ‘রাখীবন্ধন’ উৎসবের।
নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
অধুনা আলোচিত ক্ষুদ্র ঋণব্যবস্থার প্রচলনও ঘটে তার হাত দিয়েÑ বাংলাদেশের শাহজাদপুর ও পতিসরে তিনি কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে প্রথম এর সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধময় পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ কেবল উৎকণ্ঠিতই নন, বিষণ্নও হয়ে পড়েন।
তার ‘সভ্যতার সংকট’ নামের লেখাটিতে তুলে ধরেন মানুষের বিপন্নতা নিয়ে নিজের আকুলতাÑ যা বিশ্বব্যাপী মানুষকে আজও উদ্বেল করে।
ফ্যাসিবাদী-নাৎসিবাদী হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন-নিপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ দর্শনের পরও তিনি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাননি।
বরং লিখেছিলেন, ‘...মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’
তার দীর্ঘ আট দশকের কর্মমুখর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৩৪৮ সনের বাইশে শ্রাবণ।
কর্মসূচি
এ বছর রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছেÑ ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’।
জাতীয় পর্যায়ে কুষ্টিয়ার শিলাইদহসহ রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জেলায় বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
পতিসর, শাহজাদপুর ও দক্ষিণ ডিহিতে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান
কবির স্মৃতিধন্য নওগাঁর পতিসরের বর্ণাঢ্য আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, সকালেই কাচারিবাড়ি প্রাঙ্গণে শুরু হবে আলোচনা সভা। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে পতিসরের কুঠিবাড়ি। জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এর পাশাপাশি খুলনার দক্ষিণ ডিহিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বাংলা একাডেমি
রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে সেমিনার, রবীন্দ্র-পুরস্কার ২০২৬ প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি।
অ্যাকাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শুক্রবার বিকাল ৩টায় শুরু হবে এই আয়োজন।
শিল্পকলায় অনুষ্ঠান
রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করছে চার দিনের অনুষ্ঠানমালা।
সারা দেশের শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে শুক্রবার একযোগে শুরু হবে এই অনুষ্ঠানমালা।
ছায়ানটে রবীন্দ্র উৎসব
দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ছায়ানট আয়োজন করবে দুই দিনের ‘রবীন্দ্র উৎসব’।
ঢাকার শংকরের ছায়ানট ভবনের ছায়ানট মিলনায়তনে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এবং শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় এই উৎসব হবে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-সহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলেও থাকছে রবীন্দ্রজয়ন্তীর বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
দেশের বিভিন্ন স্থানেও নানা অনুষ্ঠান করছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।
রবীন্দ্রজয়ন্তী সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে স্থানীয় প্রশাসনকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছে।