প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২২ ১৮:০১ পিএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২ ২২:৫৬ পিএম
শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামের মরদেহ বাংলা একাডেমিতে নিয়ে গেলে শ্রদ্ধা জানান সহকর্মী-স্বজনরা। ছবি : প্রবা
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল তার বড় প্রিয়। কর্মব্যস্ত দিনযাপনের শেষে যখনই ফুরসত পেতেন, ছুটে আসতেন বাংলা একাডেমিতে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা এলে তার ব্যস্ততার যেন শেষ ছিল না। বিকালের শুরুতে যখন মেলার দুয়ার খুলত, ঠিক তখনই তিনি হাজির হতেন একাডেমির নজরুল মঞ্চের সামনে; তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকাশক-কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনি মেতে উঠতেন সাহিত্য আড্ডায়।
শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামকে শেষবারের মতো দেখতে এসে এভাবেই স্মৃতিচারণা করছিলেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মনির হোসেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা মেসবাহউদ্দিন সুমনসহ অন্য প্রকাশকরা।
মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) সকালে যখন প্রিয়জনদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আলী ইমামের মরদেহ আনা হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে, তখন সেখানে তৈরি হয় শোকাবহ পরিবেশ।
প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতে এসে শোকে মুষড়ে পড়েন কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, শিশুসাহিত্যিক কাইজার চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক এবং কালি ও কলম সম্পাদক সুব্রত বড়ুয়া, কথাসাহিত্যিক এবং শব্দঘর সম্পাদক মোহিত কামাল, শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন।
বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আলী ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘আলী ইমাম বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অনন্য নাম। তিনি এ দেশের কয়েক প্রজন্মের শিশুমনকে বিপুলভাবে অধিকার করেছেন তার রচিত একাধিক গ্রন্থে। মৌলিক গ্রন্থের পাশাপাশি শিশুসাহিত্যে বিচিত্র ধরনের গবেষণা ও সম্পাদনাকর্ম উপহার দিয়েছেন তিনি। ইন্টারনেট যুগের বহু আগে আলী ইমাম বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারের অজানা তথ্য অনুবাদ ও রূপান্তরমূলক রচনার মধ্য দিয়ে শিশুকিশোরদের উপহার দিয়েছেন।’
নূরুল হুদা বলেন, ‘শিশুসাহিত্যের একজন সংগঠক হিসেবেও তার অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। টেলিভিশনে শিশুকিশোরদের অনুষ্ঠান নির্মাণ ও উপস্থাপনার মধ্য দিয়েও তিনি স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন।’
পাঁচ দশক ধরে বাংলা শিশুসাহিত্যকে বহু বিচিত্র রচনা সম্ভারে সমৃদ্ধ করে যাওয়া আলী ইমাম গত সোমবার বিকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৭২ বছর বয়সি এই শিশুসাহিত্যিক দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে ভুগছিলেন।
আলী ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম অন্তু জানান, সোমবার ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রেখে মঙ্গলবার সকালে আলী ইমামের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডি-৭ নম্বর রোডের বায়তুল আমান জামে মসজিদে। সেখানে প্রথম দফা জানাজার পর মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় আলী ইমামের মরদেহ নিয়ে আসা হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে।
বাদ জোহর সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ, বামবার সভাপতি হামিন আহমেদ, মাকসুদসহ ব্যান্ড তারকারা দ্বিতীয় জানাজায় শরিক হন।
এরপর আলী ইমামের মরদেহ নিয়ে যাওয়া রামপুরার বাংলাদেশ টেলিভিশনে। আলী ইমামের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বিটিভিতে তার মরদেহ পৌঁছালে তার সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিটিভির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সেখানে চতুর্থ জানাজা হয়।
অন্তু জানান, বিটিভি থেকে বেলা ৩টার দিকে তার বাবার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আজিমপুর কবরস্থানে। সেখানে আলী ইমাম চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।
আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও চ্যানেল ওয়ান (২০০৭-২০০৮)-এর মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘হ্যালো, আপনাকে বলছি’ (১৯৯৯-২০০৪) নামে তার উপস্থাপিত সরাসরি অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিখ্যাত প্রামাণ্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’র (১৯৮০-১৯৮৭) আলোচিত প্রযোজক ছিলেন আলী ইমাম।
১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর তিনি ইউনিসেফের ‘মা ও শিশুর উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম প্রকল্প’ পরিচালক ছিলেন।
এ ছাড়া তিনি ছিলেন ‘সার্ক অডিও ভিজ্যুয়াল বিনিময় অনুষ্ঠানে’র প্রধান সমন্বয়কারী (২০০০-২০০১)। টেলিভিশন ও বেতারে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের নির্মাতা ও উপস্থাপক হিসেবে তার বিশিষ্টতা বিশেষ প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য আলী ইমাম বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০১) এবং শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১২) ছাড়াও অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন।
ব্যক্তি জীবনে আলী ইমাম এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক।