× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

শিল্পশহরের মর্যাদায় ফিরুক খুলনা

গৌরাঙ্গ নন্দী

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১১:৪০ এএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:০৭ পিএম

গৌরাঙ্গ নন্দী

গৌরাঙ্গ নন্দী

বলা হয়, খুলনা হচ্ছে শিল্প ও বন্দর শহর। একসময় শিল্প ও বন্দর নগরী হিসেবে এর নামডাকও ছিল। তবে এখন সে অবস্থা নেই। অঞ্চলগত ভৌগোলিক সীমানার কারণে বন্দর পড়েছে বাগেরহাট জেলার মধ্যে। আর শিল্পকারখানা বলতে ছিল প্রধানত সরকারি মালিকানার জুট মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল। সরকারি জুট মিলগুলো ২০২০ সালের জুনে বন্ধ করে দেওয়া হয়নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ ঘোষণা করা হয় বেশ আগে, ২০০১ সালে। সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ (কাঁচামাল)-নির্ভর ছিল নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল। নিউজপ্রিন্ট মিলের বিশাল জায়গার একটি অংশ বর্তমানে ব্যক্তি-মালিককে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে বরাদ্দপ্রাপক বিদ্যুৎ কারখানা গড়ে তুলবেন। সেখানকার উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ সরকার কিনে নেবে। প্রয়োজন না হলেও কারখানাটির উৎপাদনক্ষমতার সমপরিমাণ বিদ্যুতের দাম সরকার পরিশোধ করবে। অবশ্য, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের দিকে খুলনায় কিছু টোয়াইন ও স্পিনিং মিল গড়ে উঠেছে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে গড়ে ওঠে শতাধিক মৎস্য হিমায়িতকরণ কারখানা, অবশ্য যার অর্ধেকের বেশি বন্ধ থাকে। সে হিসেবে ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না; তবে সেবা খাতের প্রসার ঘটছে। সব মিলিয়ে খুলনার সম্ভাবনার কথা বলেন অনেকেই।

মোংলা বন্দরের সক্ষমতা অবদান রাখবে খুলনা অঞ্চলের অর্থনৈতিক  উন্নয়নে। ছবি : সংগৃহীত

মূলত ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন-পিআইডিসির প্রত্যক্ষ সহায়তায় খুলনার ভৈরব নদের তীরঘেঁষে সারি সারি জুট মিল গড়ে ওঠে। খালিশপুরেই গড়ে তোলা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল। এ কারণে সেখানকার ঘনবসতিপূর্ণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করেই জমি অধিগ্রহণ করা হয়। আর শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য, উদ্যোক্তাদের পণ্য রপ্তানির সঙ্গে সঙ্গে ছিল উৎসাহ প্রণোদনা। প্রধানত পাটপণ্য রপ্তানি সুবিধার জন্য খুলনার অদূরে মোংলা নদীর পারে গড়ে তোলা হয় সমুদ্রবন্দর। যে বন্দরটির প্রধান চ্যানেল সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে গেছে ৭০ নটিক্যাল মাইলের বেশি। আর পাট ঘিরে ব্যবসাবাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে দৌলতপুরেযদিও নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র ছিল।

মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে চলমান শিল্পকারখানাগুলোই ছিল খুলনার সম্বল। রাষ্ট্রীয় নীতিমালার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দেখা দেয়, ব্যবস্থাপনায় যুক্তরা নিজেরা লাভবান হওয়ার সব চেষ্টা করে; বিপরীতে পণ্যের বাজার ধরে রাখার জন্য যে কৌশল বা প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন বাজার খোঁজা প্রভৃতি না থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক ও পলিথিন সামগ্রী আসায় পাটপণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পাটপণ্যের বাজার হারাতে থাকে, বিপরীতে পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকে। এতে একপর্যায়ে মিলগুলোর শুধু ব্যয়ের ক্ষেত্র হিসাব করে দেখা হয় লোকসান আর লোকসান। সরকার মিলগুলো বন্ধ করে দিতে থাকে।

অবশ্য জুট মিলগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) অনেক পরামর্শ ও ঋণ দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে প্রথম পর্যায়ে (১৯৮০-৮৫ সালে) কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র মূল্যে ব্যক্তির কাছে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর পাট খাতে একাধিক দফা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এরই অংশ হিসেবে শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের নামে বাধ্যতামূলক অবসর, মিল বন্ধ প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়।

আবার ওই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে নতুন রপ্তানি পণ্য হিসেবে নোনা পানির চিংড়ি চাষের দাপট শুরু হয়। ক্ষমতাধর ও টাকাওয়ালারা খুলনার দক্ষিণাঞ্চলে, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনবসতিতে গায়ের জোরে ধানের ক্ষেতে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ শুরু করে। বিশ্বব্যাংক এ খাতের উন্নয়নে সরকারকে টাকা দেয়; ওই টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে হিমায়িত কারখানা গড়ে ওঠে। কারখানার মালিকদের খাসজমিও (সরকারি মালিকানাধীন) বরাদ্দ দেওয়া হয়। যে-যার মতো উদ্যোগ নেওয়ায় একের পর এক হিমায়িত কারখানা গড়ে ওঠে। একটি কারখানা ব্যাংকের ভাষায় সিক (দুর্বল) বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে ওই উদ্যোক্তা আর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে আবারও ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা গড়ে তুলেছেন। কেউ কেউ ঋণের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে অন্য ব্যবসার পসরা সাজিয়েছেন। এভাবে হিমায়িত কারখানার সংখ্যা বেড়েছে, যদিও হিমায়িত করার মতো প্রয়োজনীয় চিংড়ি বা মাছ কখনোই উৎপাদিত হতো না, হয়নিও।

পলিথিন বা প্লাস্টিক পণ্যের নেতিবাচক বিষয়টি নিয়ে দুনিয়াব্যাপী বিতর্কের মুখে আবারও মানুষ পাটপণ্যের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। গেল শতকের শেষ দিকে (১৯০১-২০০০) এবং চলতি শতকের (২০০১-২১০০) শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। নতুন অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার পাট খাতের উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগও করে। পাট খাত ঘিরে বিপুলসংখ্যক শ্রমশক্তিকে টিকিয়ে রাখাও এর একটি লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সরকারের বিনিয়োগনীতির সুযোগ নিয়ে অনেক পাট ব্যবসায়ী, ফড়িয়া, আড়তদার রাতারাতি রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছেন।

এর মাঝেও খুলনাতেই বেশ কিছু উদ্যোক্তা টোয়াইন ও স্পিনিং মিল গড়ে তুলেছেন। তারা মুনাফাও অর্জন করছেন। একটি ট্যানারিও গড়ে উঠেছে। শতভাগ রপ্তানিযোগ্য প্রতিষ্ঠান। প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন, চাহিদা ও উপযোগিতার কারণে যেকোনো প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ে ওঠে; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তনও করতে হয়। এটাই নিয়ম। আমাদের গার্মেন্ট শিল্পও তাই। প্রধানত বিদেশি ব্যবসায়ীদের চাহিদা মেটাতে আমাদের দেশের সস্তা শ্রমের ওপর গার্মেন্ট শিল্প গড়ে ওঠে। গার্মেন্ট পণ্যের যা কিছু সবই আমদানি করা হতো, শুধু শ্রমই ছিল। বলা চলে, সংযোজন করা হতো। এখন কিন্তু ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ উপযোগী শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এখন গার্মেন্টের প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই আমাদের দেশে উৎপাদিত হয়।

হ্যাঁ, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যে হারে শিল্পের প্রসার ঘটেছে, খুলনায় তা ঘটেনি। এমনকি খুলনা তার শিল্পশহরের মর্যাদাও হারিয়েছে। যদিও দেশেই ভারী শিল্পের প্রসার খুব একটা ঘটেনি। অনেকে বলছেন, ভারী শিল্পের যুগ চলে গেছে। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক আছে, চূড়ান্তভাবে কোনো সিদ্ধান্ত টানাও যায় না। তবে এটি ঠিক, ভারী শিল্প মানে বেশি বিনিয়োগ, বেশি শ্রমিক। প্রকৃতপক্ষে যেকোনো উদ্যোক্তাই আগে হিসাব করেন, যে পণ্য উৎপাদিত হবে তার বাজার আছে কি না, বিক্রি হবে কি না, মুনাফা হবে কি না? মুনাফা না হলে বিনিয়োগ হবে না, এটাই স্বাভাবিক। শিল্পের ক্ষেত্রে খুলনা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাধা সস্তায় জ্বালানি না পাওয়া। এত দিন যোগাযোগব্যবস্থাও খারাপ ছিল। পদ্মা সেতু হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে, তবে সস্তায় জ্বালানি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা এখনও তৈরি হয়নি। ধারণা করা হয়েছিল, পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে খুলনা অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়বেনা, প্রায় দুই বছরেও তেমনটি ঘটেনি। শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সুখবর এখন পর্যন্ত নেই।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ত্রিদেশীয় যোগাযোগের জন্য পথ খুলে যাচ্ছে। মোংলা বন্দর প্রতিবেশী দেশগুলো ব্যবহার করতে সম্মত হয়েছে। অবশ্য মোংলা ঘিরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। প্রধানত নৌ-যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগাতে তরলীকৃত গ্যাস আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাত করার কারখানা গড়ে উঠছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত-নেপাল-ভুটান মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি করবে বলে শোনা যাচ্ছে; যদিও ২০১০ সাল থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। যদি তেমনটি হয়, তবে মোংলায় কাজ বাড়বে, কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হবে। সে ক্ষেত্রে খুলনা সংযোগকারী অবস্থানে থেকে একটি ট্রানজিটের শহরে পরিণত হতে পারে।

অবশ্য শিল্পে বিনিয়োগের জন্য যে ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন, আমরা তার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছি। কারণ উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জ্বালানির জোগান দেওয়া বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশের একটি পূর্বশর্ত। কারণ এ খাতগুলোয় সরকারিভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। তবেই বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারেন বা করেন। কারণ এ খাতে বিনিয়োগ বেশি, মুনাফা নেই। এ কারণে এসব খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ হয় না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ চাই। তাই জমি বলুন আর ব্যাংক ঋণ বলুন। বেসরকারি উদ্যোক্তা কোনো ঝামেলায় যেতে চায় না, সে তার পুঁজির নিরাপত্তা ও নিশ্চিত মুনাফা চায়; তাই বেসরকারি উদ্যোক্তা তার পক্ষে যত ধরনের সুবিধা থাকতে পারে, সেগুলো প্রাপ্তির নিশ্চয়তা চায়। বলাই বাহুল্য, আমাদের সরকার বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশের জন্য সব ধরনের নিয়মনীতি তৈরি করেছে। এসব সুযোগসুবিধা নিয়ে খুলনা অঞ্চলে অনেক বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগ মানে কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থান তো চাই-ই। শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে খুলনা আবারও তার শিল্পশহরের মর্যাদা ফিরে পাবে।

  • খুলনার সিনিয়র সাংবাদিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা