প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১১:০৯ এএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:০৬ পিএম
অরূপ তালুকদার
প্রমত্তা পদ্মার বুকে
‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’ চালু হওয়ার পর যুগ যুগ ধরে অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে
যে অভাবনীয় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। শুধু দক্ষিণাঞ্চলই
নয়, বরং বলতে হয় পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চালচিত্রই সামগ্রিকভাবে পাল্টে গেছে। অঞ্চলের কয়েক
কোটি মানুষের জীবনযাপন ধারাসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ পরিবর্তন দৃশ্যমান। মাত্র কয়েক বছরের
ব্যবধানে দক্ষিণের বদলে যাওয়ার ঘটনা
নিজেদের
কাছেই
বিস্ময়কর।
কিন্তু
এটা বাস্তব সত্য। আর এ বাস্তবতা এলাকার
মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে সমৃদ্ধির প্রশস্ত পথে এগিয়ে যাওয়ার।
দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর। এ দীর্ঘ সময়েও তেমন কোনো
শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ‘অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চল আর অবহেলিত থাকবে না...’
বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ
ঘোষণার মধ্য দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে এ অঞ্চলের সড়কপথের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন। শত শত কিলোমিটার
অপ্রশস্ত সড়ক প্রশস্ত হয়েছে। একটার পর একটা ব্রিজ, কালভার্ট নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে; যা এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাই বদলে দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে
বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত ১০-১২ ঘণ্টার পথ সময়ের
হিসাবে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বপ্নজয়ের কাহিনী, পদ্মার ওপর
দৃশ্যমান হয়েছে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’।
পটুয়াখালীতে পায়রা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু সমাপ্তি টানে বরিশাল-কুয়াকাটার পথে ফেরি পারাপারের। ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের
বৃহত্তম শহর খুলনা একসময় বিখ্যাত ছিল পাটকল, নিউজ প্রিন্ট মিলসহ বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য। ১৯৭৫-এর পর সড়কপথে
যোগাযোগের নানা প্রতিকূলতা, গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে একে একে বন্ধ হয়ে
যায় এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা
সেতু উদ্বোধন করার পর পুনরায় যেন শিল্প ক্ষেত্রে প্রাণসঞ্চার হতে থাকে। শিল্পোদ্যোক্তারা
নতুন করে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য নতুন উদ্যমে বিনিয়োগে
উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।
অ্যাগ্রো
প্রসেসিং ইউনিট,
ফার্মাসিউটিক্যালস
কারখানা,
রাইস
ব্রান অয়েল মিল,
অটোমোবাইল
সার্ভিসিং সেন্টার,
সিরামিক
ফ্যাক্টরি,
কাঁকড়া
প্রক্রিয়াজাত ইউনিটসহ বেশ কিছু উদ্যোগ খুলনা-মোংলা সড়কের দুই পাশে নির্মিত হয়েছে এবং এখনও
হচ্ছে।
ভবিষ্যতে
অন্য আরও বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান দ্রুতই গড়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন
কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, পুরোনোসহ নতুন শিল্পোদ্যোক্তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান
গড়ে তোলার বিষয়ে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে উদ্যোক্তাদের জন্য কমপক্ষে ৩৮টি
সংস্থার নানা ধরনের লাইসেন্স, প্রয়োজনীয় অনুমোদনসহ বিনিয়োগ সম্পর্কিত শতাধিক সেবা
প্রদান দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্নের কাজ শুরু করে দিয়েছে সংস্থাটি। বলা হয়েছে, এ ‘সেবা’ বিশ্বের
যেকোনো স্থান থেকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেও গ্রহণ করতে পারবেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
একসময়ের অবহেলিত
দক্ষিণাঞ্চল শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই এখন নানা ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের
কাজ চলমান।
পটুয়াখালী
জেলা প্রশাসন থেকে ইপিজেড স্থাপনে সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের পচাকোড়ালিয়া
মৌজায় প্রায় আড়াই একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা
হয়েছে।
দেশের
বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এ অঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান
গড়ে তুলতে।
সরকারি-বেসরকারি এসব বিনিয়োগ বদলে তেবে অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপরেখা।
২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর
বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত লেবুখালীর
পায়রা নদীর ওপর ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার লেনের দৃষ্টিনন্দন
পায়রা সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে মাওয়া থেকে দক্ষিণবঙ্গের একেবারে
শেষ প্রান্তের কুয়াকাটাসহ বিশাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে ফেরিবিহীন
যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়েছে।
এখন রাজধানী ঢাকা থেকে
সর্বোচ্চ সাত ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যায় প্রকৃতির অবারিত লীলাভূমি
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় কুয়াকাটায় এখনই বেড়ে গেছে দেশি-বিদেশি
পর্যটকের সংখ্যা। চলাচল
শুরু করেছে অত্যাধুনিক
বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। সৈকতসংলগ্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে পর্যটকের জন্য গড়ে উঠেছে
হোটেল-মোটেলসহ ছোটবড় রেস্তোরাঁ। আবাসনসহ পর্যটনের আনুষঙ্গিক বিষয় ঠিকঠাকমতো বাস্তবায়ন
করা গেলে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র; যে সৈকত থেকে পর্যটক
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার দেখার সুযোগ পাবে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সড়কপথে দেশের অন্যান্য স্থানের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে পদ্মা সেতুর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও ব্যবসাবাণিজ্যও অভাবিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রবন্দরসহ যোগাযোগসুবিধার কারণে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভারী ও মাঝারি ধরনের শিল্প ও কলকারখানা গড়ে উঠবে। যেখানে কর্মসংস্থান ঘটবে কয়েক লাখ মানুষের। স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকবে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। তখন শুধু এ অঞ্চল নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে একদা অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চল।