× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

শ্রীভূমিতে সম্ভাবনার হাতছানি

কাসমির রেজা

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১০:৪৪ এএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ১২:০৬ পিএম

কাসমির রেজা

কাসমির রেজা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’ হিসেবে। এ সুন্দরী শ্রীভূমি সিলেট শুধু রূপসৌন্দর্যে নয়, সম্পদেও ভরপুর। সিলেট একটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এলাকা। সিলেটের প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, কয়লা, চুনাপাথর, সিলিকা বালি, পাথরের পাশাপাশি হাওরে উৎপাদিত মাছ ও ধান দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বড় উৎস। সিলেটের প্রকৃতি ও মানবসম্পদ যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।

সিলেটের প্রায় ২০ লাখ মানুষ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সিলেট বিভাগের চার জেলার প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছে ২৪৭ কোটি ডলার; যা দেশের মোট প্রবাসী আয়ের সাড়ে ১১ শতাংশ। সিলেটের বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের গবেষণায় দেখা যায়, প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের দুই তৃতীয়াংশই ব্যয় হচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এসব অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ত। এতে বেকার সমস্যাও লাঘব হতো। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে হবে।


সিলেটের প্রবাসী শ্রমিকের সিংহভাগই অদক্ষ। তাই তাদের আয়ও কম। এসব শ্রমিককে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করে বিদেশে পাঠাতে পারলে তাদের জনপ্রতি আয় অনেক বাড়ত। সিলেটে ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর অনেকেই এখন তৃতীয় প্রজন্ম। তারা দেশে আসতে খুব একটা আগ্রহী নয়। তারা অনেকেই দেশের বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে সম্পদ সৃষ্টি করছে। এটি প্রবাসী আয় কমিয়ে দিচ্ছে। দেশে বিমানবন্দরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হয়রানির শিকার হওয়া, এলাকার লোকজন দ্বারা প্রতারিত হওয়া, শহরের যানজট, পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা কারণে তৃতীয় প্রজন্ম দেশবিমুখ হচ্ছে।

এ তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। কেউ কেউ দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। এদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগালে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

প্রাচীনকাল থেকেই সিলেটের রূপবৈচিত্র্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণগুলোর বেশ কটিই সিলেটে অবস্থিত। সিলেটের জাফলং, মাধবপুর লেক, টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ (নীলাদ্রী) লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, শিমুলবাগান এবং সিলেটের চা-বাগানগুলোয় পর্যটকের ঢল নামে। হযরত শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতেও বহুসংখ্যক মানুষ সিলেট আসে। রাস্তাঘাট, হোটেল-মোটেলসহ সর্বত্র উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সিলেটে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হতো; যা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখত।

সিলেট একটি হাওর অধ্যুষিত এলাকা। হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার তথ্য অনুসারে সিলেটের চার জেলার ৪৮.৯৩ ভাগজুড়ে হাওর। খানা আয়ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪.৩ থেকে ১৮.৭-এ নেমেছে। একই সময়ে এ হার সিলেটে ১৬.২ থেকে বেড়ে ১৭.৯ হয়েছে। অর্থাৎ সারা দেশে যখন দারিদ্র্যের হার কমেছে সিলেটে তখন বেড়েছে। সিলেটের মোট শ্রমশক্তির ৮৩.৭ ভাগই গ্রামে বাস করে। এ গ্রামীণ দারিদ্র্য কমাতে হলে হাওরাঞ্চলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। হাওরে পরিবারসমূহে আয়ের প্রধান উৎস মাছ ও ধান। তাই হাওরে দারিদ্র্য কমাতে হলে মাছ ও ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

হাওরাঞ্চলে ধানের উৎপাদন কমার অন্যতম প্রধান কারণ অকালবন্যায় ফসলহানি। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের অকালবন্যায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে। ২১৪ মেট্রিক টন মাছের ক্ষতি হয়েছে। গত ২৪ বছরে হাওরে আটবার এ ধরনের বড় আকারের ফসলহানি হয়েছে। বারবার ফসলহানির ফলে হাওরের অনেক গৃহস্থ পরিবার সর্বস্বান্ত। তাই সিলেটের দারিদ্র্য কমানোর জন্য ফসলহানি রোধ করতেই হবে। এজন্য টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি হাওরের নদ-নদী ও বিলগুলো খনন করতে হবে। বাঁধ নির্মাণে বিলম্ব ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্পজীবনের ও পানিসহনীয় ধানের জাত আবিষ্কার এবং ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

হাওরে দারিদ্র্য নিরসনে শুধু ধানের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। যেহেতু হাওর এলাকা বছরের অর্ধেক সময় পানিবেষ্টিত থাকে তাই হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য হাওরে মাছের প্রজননকালে অন্তত দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখা দরকার। তবে এ দুই মাস জেলেদের প্রণোদনা দিতে হবে। হাওরের জেলেদের প্রণোদনা দিয়ে দুই মাস মা মাছ ও পোনা ধরা বন্ধ রাখতে পারলে হাওরে মৎস্যবিপ্লব ঘটবে। মাছের ফলন বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। হাওরের সুস্বাদু মাছের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর নানা দেশে। এসব মাছ বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা যাবে।

হাওরবাসীর জীবনজীবিকা অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর। তাই হাওরবাসীর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হবে। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশে দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করতে না পারলে হাওরের সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না। তখন এ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই দুর্যোগ প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য দেশি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্‌সাও চায় হাওরবাসী। একই সঙ্গে হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাপক ভিত্তিতে নদী খনন ও অধিক হারে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির জন্য সিলেটে অবকাঠামো উন্নয়ন আবশ্যক। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কনটেইনার টার্মিনাল ও ব্যাগেজ সিস্টেম চালু, কোম্পানীগঞ্জে হাইটেক পার্ক, শেরপুর ও হবিগঞ্জে ইকোনমিক জোনের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশনে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু, তামাবিল পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়ে ও সুনামগঞ্জে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ হলে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জনপদ সিলেট। প্রবাসে ও দেশে সিলেটের তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে অযুত সম্ভাবনা নিয়ে। তারা নিজেদের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়। এজন্য তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। প্রয়োজন রয়েছে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও।

  • সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা