প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২
অনুপম সেন
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:৪৪ পিএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:০৮ এএম
অনুপম সেন
ত্রিশ লাখ প্রাণের
বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান। তার সারা জীবনব্যাপী সাধনা ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের
সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ
সহজ ছিল না। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দেশের অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল।
যুদ্ধের অব্যবহিত সময়ে অনেক বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণে এসেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত
দেশ পর্যবেক্ষণ করে হতবিহ্বল অনেকেই বলেছিলেন, হতশ্রী এই দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ
অনাহারে মারা যাবেন। অনেকে ভেবেছিলেন, দেশে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ হবে। কিন্তু এমন কিছুই
হয়নি। বঙ্গবন্ধু শক্ত হাতে দেশ পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন। দেশকে দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা
করেছিলেন। ভারতে অবস্থানরত প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসিত করেন। পাকিস্তানি সেনারা
নদ-নদীর এই দেশের হাজার হাজার পুল-কালভার্ট ও ব্রিজ ধ্বংস করে। বঙ্গবন্ধুর সুব্যবস্থাপনায়
স্বল্প সম্পদ পুঁজি করেই অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, সংস্কার করা হয়।

যুদ্ধের অভিঘাতে
দেশের দুটি বড় ব্রিজ অর্থাৎ ভৈরব ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছিল। তিনি
এই দুটি ব্রিজও পুনর্নির্মাণ করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে বহু জাহাজের সলিল সমাধি ঘটে। সোভিয়েত
ইউনিয়নের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারোপযোগী করা হয়। যুদ্ধের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক
মুদ্রার রিজার্ভে এক ডলারও ছিল না। নিরাপত্তা সংকট মেটানোর উপযুক্ত সামরিক রসদ আমাদের
ছিল না। সামরিক বাহিনী পরিচালনার অবকাঠামোর অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার
পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু দেশকে পুনর্নির্মাণের সুগম পথে নিয়ে আসেন। মাত্র
১০ মাসের মধ্যে একটি অসাধারণ সংবিধান জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। নিয়েছিলেন পঞ্চবার্ষিকী
পরিকল্পনা। এভাবেই পরিকল্পিত বাংলাদেশের মঞ্চ গড়ে দেন তিনি। এই উন্নয়ন-অগ্রগতির পথ
কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে পঁচাত্তরে বাঙালি জাতির ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম ঘটনার মধ্য দিয়ে যখন
বঙ্গবন্ধুকে পঁচাত্তরে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
কোনো দেশের জন্মদাতাকে
নিষ্ঠুরতম উপায়ে হত্যা করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার পরিবারের
সদস্যদেরও ঘাতকরা চরম অমানবিক পন্থায় হত্যা করে। ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু
রাসেলও। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে ঘাতকরা জাতির পিতার আত্মীয়দের
খুঁজেও হত্যা করে। এই ঘাতকদের নরপশু হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার
পর বাংলাদেশের ইতিহাসকে পিছিয়ে যাওয়ার ইতিহাস বললে অত্যুক্তি হবে না। ১৯৭৩-৭৪ সালে
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। পরবর্তী আট বছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি সিকিভাগও
বাড়েনি। বঙ্গবন্ধুর সুপরিকল্পনায় যে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পর যে ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হয় তাকে আমি লুম্পের
বা ঘুরপাকের অর্থনীতি বলে চিহ্নিত করি। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’Ñ এমন ধারণাই যেন ছিল নীতিনির্ধারকদের
মধ্যে। টাকা কোনো সমস্যা নয়। তাই শাসকরা ব্যাংক খাত এক শ্রেণির মানুষের জন্য উন্মুক্ত
করে দেয়। সামান্য বন্ধকের বিনিময়ে জাতীয় অর্থনীতির কোষাগার উন্মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে
আর্থিক খাতে অপশাসনের পথই উন্মুক্ত করা হয় এভাবে। সামরিক শাসকদের তোষামোদ করতেন যারা
এবং তাদের নেকনজরে থাকা ব্যক্তিদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল। শুরু
হয় ঋণাত্মক অর্থনীতির যাত্রা।
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষশক্তি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। ওই সময় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ
ছিল প্রায় ২৪ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা। তখনকার মুদ্রামানের হিসাবে বিরাট অঙ্কের ঋণ।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সামরিক বা আধ-সামরিক সরকারব্যবস্থার নাগপাশমুক্ত হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাঋদ্ধ সরকার গঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে জনগণের ওপর হওয়া
অন্যায়ের বিচারকার্য শুরু করে। জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি
ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের নানাবিধ পরিকল্পনা নেওয়া শুরু হয়। ১৯৯৬ থেকে
২০০১ সালের মধ্যে গৃহীত হয় উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা। দেশের ইতিহাসে বড় পরিকল্পনাগুলোও
নেওয়া হয় এই সময়ে। এর মধ্যে গঙ্গাচুক্তি ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি অন্যতম।
আমি মনে করি,
জাতীয় স্বার্থে এই দুটি চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর উভয় দেশের নেতৃত্ব নতুন দিল্লিতে মিলিত হয়ে একটি ৩০ বছরের
সামগ্রিক চুক্তি সাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা
থেকে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন করা হতে থাকে। পূর্ববর্তী ৪০ বছরের গড় মাত্রা অনুযায়ী
ভারত গঙ্গার পানির ভাগ পেতে থাকে। এমন একটি চুক্তি তখনই সই হতে পারে যখন দুই পক্ষ থেকেই
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নেতৃত্বের আগ্রহ তৈরি হয়। তৎকালীন রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ
এশিয়াতে সেই বিরল শর্তটাই পূরণ হয়েছিল গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মাধ্যমে। গঙ্গা চুক্তির
মতো জটিল বিষয় নিয়ে এগিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহস দেখিয়েছিলেন। পাকিস্তান
শাসনামলে ভারতের সঙ্গে পঞ্চনদী পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের ভেতর দিয়ে
প্রবাহিত পাঁচটি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি
কোনোভাবেই আশার আলো দেখতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রায় একুশ
বছরেও গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি।
আমরা জানি, নব্বইয়ের
দশকে পাহাড় উত্তাল হয়েছিল। পাহাড়ে সংঘাত-সহিংসতা হয়ে উঠেছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে অধ্যাপনায় নিযুক্ত থাকায় এখানকার সংকটগুলো সম্পর্কে ভালোভাবেই
অবহিত রয়েছি। বিকাল পাঁচটার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে কাউকে বাইরে থাকতে
দেওয়া হতো না। কারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে
সম্ভব ছিল না। সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছিলেন।
ম্যালেরিয়ার প্রকোপেও অনেকে মারা গিয়েছিলেন। স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাব ছিল প্রকট। পার্বত্য
চট্টগ্রামে নানা ধরনের ব্যাধির প্রকোপ ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে পার্বত্য
চট্টগ্রামকে উন্নয়নমূলক অবকাঠামোর প্রাপ্তিগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। পার্বত্য
শান্তিচুক্তি নিঃসন্দেহে আমাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য বড় অর্জন।
আটানব্বই সালে
ভয়াবহ বন্যা হয়। ভয়াবহ এই বন্যায় বহু অঞ্চল দীর্ঘ দিন পানিতে নিমজ্জিত ছিল। বন্যায়
ফসল ও সম্পদহানি ঘটে। এই বিপর্যয়ের মুখেও কোনো মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেনি যা আরেকটি
বড় অর্জন। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কিংবা কাবিখাসহ নানাবিধ কল্যাণমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রথম খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার
আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে। এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস অর্জনের ইতিহাস। ২০০৮ সালের পর থেকে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনের খেরোখাতা ভরাট হতে শুরু করে। এক সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন
ঝুড়ি বলে অভিহিত করা হতো। আর আজ বাংলাদেশকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখছে। অনেকের কাছে
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। হেনরি কিসিঞ্জার অভিহিত ‘বটমলেস বাস্কেট’ আর বটমলেস
নেই। আমাদের অর্থনীতির ঝুড়িতে আজ তলা যুক্ত হয়েছে।
উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মহাসড়কে বাংলাদেশ। কেউ বাংলাদেশকে
দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা জানি, রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ বিশ্বকে
সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশে অর্থনীতির সংকট প্রবল। এই সংকটের অভিঘাত
থেকে মুক্ত নই আমরাও। তারপরও আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে সমৃদ্ধির পথে। এ অর্জন নিঃসন্দেহে
আমাদের জন্য বড় অর্জন।