প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ২
এম হুমায়ুন কবির
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৪ ১২:০৮ পিএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪ ০০:১৭ এএম
এম হুমায়ুন কবির
স্বাধীনতার বায়ান্ন
বছর অতিক্রান্তে বিশ্বের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন নিশ্চয়
কম নয়। বিশ্বের অন্য ভূখণ্ডের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তুলনামূলক
বেশি এ কথা বললে অত্যুক্তি হয় না। তারপরও আমাদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর কাজ করতে
হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের সাফল্য এক্ষেত্রে দৃশ্যমান। ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আমাদের প্রেক্ষাপটে
যথেষ্ট রয়েছে। তবু বিশ্ব দরবারে আমাদের কিছু মৌলিক স্বার্থ রয়েছে। সেই মৌলিক স্বার্থোদ্ধারে
বিশ্ব দরবারের তরফে আমরা সহযোগিতাও পেয়েছি। বিশেষত স্বাধীনতার পর থেকে অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট
অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) বা যেটিকে বৈদেশিক সহযোগিতা বলা হয় সেটি আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে
পেয়েছি। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন দেশে কিছু বাড়তি সুযোগ-সহযোগিতা পাচ্ছি। কিছু
কিছু দেশে আমরা এখনও বিনা শুল্কে বাণিজ্য সম্প্রসারণের কাজ করতে পারছি। শুধু তাই নয়,
বিভিন্ন দেশ আমাদের ঋণ সুবিধা দেয়। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও আমরা বিশেষ রেয়াত পেয়ে থাকি।

অভিবাসন কিংবা
শ্রম রপ্তানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চুক্তি না থাকার পরও আমাদের জনশক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগও আমাদের রয়েছে। এসব নানা বিষয় যাচাই করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার
পর বায়ান্ন বছরে ছোটখাটো দুয়েকটি ঘটনা বাদে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও
কাঠামোগত উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখে নিরাপত্তাজনিত
বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আমাদের জাতীয়
স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছি। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মিয়ানমারের
সঙ্গে আমাদের কিছু সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে
রেখেছে এবং আমাদের জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই আপাতত গুরুত্বের বিষয়। আমাদের আবাসভূমি
অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নিরাপত্তার বিষয়টি তেমনভাবে বিঘ্নিত হয়নি বলা যায়।
জাতিসংঘের অবস্থান
ও ভূমিকা নিয়ে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে নানা প্রশ্ন দেখা দিলেও আমাদের জন্য বহুজাতিক সংস্থাটি
এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এই সংস্থাটিতে কূটনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে আমাদের জাতিগত স্বার্থ
আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও বাংলাদেশ
নানাভাবে অবদান রেখে ভাবমূর্তি সমুন্নত রেখে চলেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সম্ভাবনা
ও কাঠামো নিয়ে যে শঙ্কা ছিল বর্তমানে তা নেই। এই মুহূর্তে আমরা আমাদের প্রবৃদ্ধির হার
বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগী। শুধু তাই নয়, শিগগিরই আমরা ২০২৬ সাল নাগাদ উচ্চ-মধ্যম
আয়ের দেশের কাতারভুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বড়
অর্জন এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। যদি লক্ষ্য পূরণ হয় তাহলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে
কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারভুক্ত হওয়ার পদক্ষেপে
এ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক পালাবদল ঘটবে। ভূরাজনৈতিক বিবর্তনের রূপটি অতীতের যেকোনো সময়ের
তুলনায় ভিন্ন হবে। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর ও আশির দশকে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের
সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গও টেনে আনতে হয়।
বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে দুই ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা
যাচ্ছে। একটি হচ্ছে, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
আর অন্যটি হচ্ছে, চীন ও ভারতের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা। দুই স্তরের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা
আমাদের মতো নিরপেক্ষ বা শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের জাতীয় স্বার্থোদ্ধারের জন্য কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে আরেকটি
বড় সংকট দেখা দিয়েছে।
চীন, মিয়ানমার,
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে
দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের উদাহরণ টানতেই হয়। আমরা দেখছি, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা
জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা পরিচালিত করে জান্তা সরকার। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর
ওপরও জান্তা সরকার নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতে শুরু করে। এর ফলে মিয়ানমারে বিদ্রোহী সশস্ত্র
গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে এবং মিয়ানমারে গৃহদাহ বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা
গণহত্যার ফলে দীর্ঘ ছয় বছর ধরেই আমরা রোহিঙ্গাদের মানবিক তাগিদে আশ্রয় দিচ্ছি। এর ফলে
আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান নানাভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মিয়ানমারে সামরিক-রাজনৈতিক-জাতিগত
সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ
বরাবরই এ বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে কূটনৈতিক মহলে উপস্থাপন করছে। মিয়ানমার কিংবা আমাদের
পার্শ্ববর্তী দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে এর আঁচ আমাদের ওপরও এসে পড়ে। বিগত
বায়ান্ন বছরে এ ধরনের ভূরাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমরা হইনি বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে
বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে যা প্রশংসনীয়। আমরা দেখছি, ভারতেও সাম্প্রদায়িকতার
ওপর ভিত্তি করে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটছে যা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের জন্য
বড় উদ্বেগের কারণ। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ঐতিহাসিকভাবে একটি বিষফোঁড়া। বিশের দশকের
মতো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ভূখণ্ডের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত
হতে পারে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার
দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান,
মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার এমনকি সম্প্রতি আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থিতিশীল
হয়ে উঠছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই সংকটগুলো আমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
তৈরি করছে যার মুখোমুখি আমরা আগে হইনি। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিদ্যমান নানামুখী
চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত। আমি মনে করি, এ বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবিত
হওয়ার কিছু নেই। বিগত বায়ান্ন বছরে আমরা যে ধরনের কূটনীতি দর্শনের ভিত্তিতে কূটনৈতিক
কার্যক্রম পরিচালনা করেছি সে দর্শনের ওপরেই আস্থা রাখতে হবে। আমাদের কূটনৈতিক দর্শনের
মূল ভিত্তিÑ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। নীতিগতভাবে এই মূলমন্ত্র
থেকে সরে আসার প্রেক্ষাপট এখনও তৈরি হয়নি। তবে কৌশলগতভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের
ভাবতে হতে পারে। প্রশ্ন দাঁড়ায়, এক্ষেত্রে করণীয় কী। এতদিন অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা
ও কূটনীতিকে দুটো আলাদা ব্যবস্থা হিসেবে আমরা বিবেচনা করে এসেছি। কিন্তু ভূরাজনৈতিক
বাস্তবতায় যে পরিবর্তনের আভাস মিলছে তাতে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির
সমন্বয় করা জরুরি। উন্নয়ন ও কূটনৈতিক তদবিরে বড় ধরনের সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ
উন্নয়নশীল দেশের কাতারভুক্ত হওয়ার পর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে
যাতে।
রাজনীতি, শিক্ষা,
অর্থনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ নানা ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবর্তন আনতেই হবে।
উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর উৎপাদনশীল হতেই হবে। কূটনীতি ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমাদের
অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হলে এমন সমন্বয়ের বিকল্প নেই। মনে রাখতে
হবে, অনুন্নত দেশ হওয়ায় বাইরের দুনিয়া থেকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা এতদিন পাচ্ছি তা
আর থাকবে না। তাই আমাদের জাতীয় স্বার্থেই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তুতি
নিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর বাইরের দুনিয়া তো বটেই আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের
সঙ্গেও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা করতে হবে। সব রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে পুনর্বিন্যাস
করতে হবে। তখনই আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতার সক্ষমতা যাচাইয়ের নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।
কাজেই এ বিষয়ে প্রস্তুতি রাখা জরুরি।
আমাদের অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতির গতিবৃদ্ধির জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের
কাঠামোর সঙ্গে কূটনীতির সমন্বয়ের কাজ এখনই শুরু করা জরুরি। যদি তা না করা হয় তাহলে
কূটনৈতিক মহল বাইরের দুনিয়ার কাছে আমাদের তথ্য উপস্থাপন করবে কীভাবে? তাদের কাছে যদি
আশ্বাস দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য না থাকে তাহলে কোনোভাবেই কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হবে
না। দেশে উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছুনোর জন্য কূটনৈতিক মহলের পদক্ষেপ জরুরি। কিন্তু
পণ্যের গুণগত মান বা উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে যদি কূটনৈতিক মহলের ধারণাই না থাকে
তাহলে তা সম্ভব হবে না। এজন্যই আমাদের হাঁটতে হবে সমন্বয়ের পক্ষে। আগামীর চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই যেন নেওয়া হয় এই প্রত্যাশাই রইল।