জামশেদ নাজিম
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২২ ১৮:৩৩ পিএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২২ ১৩:১৪ পিএম
মুগদা জেনারেল হাসপাতালের আজকের চিত্র। ছবি : প্রবা
রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্বে ঘনবসতি এলাকায় অবস্থিত মুগদা জেনারেল হাসপাতাল। ৫০০ শয্যার হাসপাতালে শুক্রবার বহির্বিভাগ খোলা নেই। সিএনজি থেকে নেমে ছেলেকে কোলে নিয়ে জরুরি বিভাগে ছুটছেন এক মা। জরুরি বিভাগে লম্বা লাইন। চিকিৎসক ব্যস্ত অন্যান্য রোগীর পরীক্ষার কাগজপত্র দেখতে। তাই ছয় বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন শরিফুলের মা।
কথা বলতে তিনি জানালেন, কদিন আগে ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি আসেন বেড়াতে। সেখান থেকে নিজের বাড়ি শরীয়তপুরে চলে যান। তিন দিন আগে ছেলের জ্বর ও বমি হয়। স্থানীয় চিকিৎসক দেখানো হলেও কিছুতেই বমি আর জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসে না। পরে বাবার বাড়ি বিক্রমপুরে আবার ফিরে আসেন। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষার পর জানতে পারেন ছেলের ডেঙ্গু। তাই বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে সুচিকিৎসা নিতে এখানে আসা।
শরিফুলের মতো আরও অনেক শিশু কোলে নিয়ে জরুরি বিভাগে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন মা কিংবা বোন। ১০ টাকার টিকিট কেটে কেউ চিকিৎসা নেবেন, কেউ ভর্তি করাবেন। টিকিট হাতে পেতেই সবাই ছুটছেন পাশের চিকিৎসকের রুমে। দরজা দিয়ে তাকিয়ে চিকিৎসককে দেখার সুযোগ নেই। তাকে তিন পাশ থেকে ঘিরে রেখেছেন রোগীর স্বজনরা। কে কার আগে নিজের রোগী দেখাবেন নীরবে সেই প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় সবার মধ্যে।
রুমে প্রবেশ করতে দেখা যায় একজন চিকিৎসক। তিনি বেশ আন্তরিকভাবে এক এক করে রোগীর চিকিৎসাপত্র ও পরীক্ষার কাগজপত্র দেখে যাচ্ছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন নেই তার। সবাইকে ভর্তি দিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেবিন চাইলেও আপত্তি করছেন না। খোঁজ নিয়ে আসতে বলছেন ফাঁকা আছে কি না।
অন্তত পনের জন রোগীর চিকিৎসা শেষে রুমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান, আপনার কী সমস্যা? সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ডেঙ্গু রোগীর খবরাখবর জানতে সরেজমিন আসা বলতে ডাক্তার তারানা তাসলিম বলেন, ডেঙ্গু রোগী আসছেই। সকাল ৮টা থেকে রোগী দেখা হচ্ছে, এখন পৌনে ১১টার মধ্যে অন্তত ৯০ জন রোগী দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৪ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কম করে ৩০ জনকে।
ছুটির দিনে বহির্বিভাগ বন্ধ, জরুরি বিভাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা দুজন কলিগ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিচ্ছি। ডেঙ্গু রোগীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য ১০ তলায় একটা ওয়ার্ড করা হয়েছে, সেখানে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে আর সাধারণ রোগীদের আমরা নির্ধারিত ওয়ার্ডে দিয়ে দিচ্ছি; সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক দেখছেন।’
কথা শেষ হতে না হতে ডেঙ্গু রিপোর্ট নিয়ে হাজির একজন। তার ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত। চিকিৎসকের কাজ শেষ হতে তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, তার স্ত্রী সাত দিন আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খবর পেয়ে তিনি কাতার থেকে ছুটে এসেছেন তিন দিন হয়েছে। দুই দিন আগে ছেলে মেজবাহর জ্বর হয়। গতকাল চিকিৎসক ডেঙ্গু পরীক্ষা দেন; ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় আজ ছেলেকে ভর্তি করা হয়েছে মায়ের কেবিনে।
কথা বলতে বলতে লিফটের সামনে আসতেই লম্বা লাইন। কারও হাতে ডাব, কারও হাতে ওষুধ। দুটি লিফটে সমান লাইন। ডাব হাতে একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার শাশুড়ি ডেঙ্গু আক্রান্ত। হাসপাতালের সামনে ছোট ডাবের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা, তাই গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ থেকে নিজেদের গাছ থেকে ডাব পেড়ে আনা হয়েছে।
লিফট থেকে নামতেই ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। গোটা এরিয়া যেন অস্থায়ী ক্যাম্প। কেউ শুয়ে আছেন ফোমের ওপর চাদর বিছিয়ে, কেউ তার মাথার ওপর সিটে। কার পায়ের কাছে কে মাথা দিয়ে শুয়ে আছেন সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। কেউ বিরক্ত নন।
কারও মাথার ওপর লম্বা পাখার ফ্যান চলছে, কারও মাথার পাশে ছোট ফ্যান। কেউ চাইলেও মশারি খাটিয়ে নিজেকে আলাদা করতে পারবেন না। সবার পাশের স্যালাইন ঝোলানোর লম্বা স্ট্যান্ড আর হাতের ক্যানোলা বলে দেয় এরা ডেঙ্গু রোগী। নারী-পুরুষ বা শিশু সবাই শুয়ে আছেন মিলেমিশে, যেন শতাধিক মানুষের একটা পরিবার।
ফ্লোরজুড়ে এলোমেলোভাবে শুয়ে থাকা রোগীদের অতিক্রম করে একটু সামনে যেতেই পরিষ্কার হয় এটা নিয়ম অনুসারে নির্মিত হাসপাতালের কোনো ওয়ার্ড নয়। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মূলত ফ্লোরটি কেবিন ব্লক হিসেবে তৈরি করা। অবশিষ্ট ফাঁকা জায়গাটুকু ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অস্থায়ী ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেই শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও পুরুষ সবার চিকিৎসা চলছে।
একাধিক রোগী ও রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি করছেন না চিকিৎসকরা।
দায়িত্বরত নার্স রোজিনা ইসলামের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মার্চে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে হাসপাতাল পরিচালক জরুরি ভিত্তিতে কিছু সিট ও ফোমের বেডের ব্যবস্থা করে ডায়রিয়ার চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। জুনের শুরুর দিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ডায়রিয়ার রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে মেডিসিন বিভাগের অধীনে এখানেই ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখানে রোগীদের সেবার জন্য চারজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বরত চিকিৎসক থাকেন নবম তলায় মেডিসিন বিভাগে। প্রয়োজনে চিকিৎসক আসেন। আর রুটিন অনুসারে এসে রাউন্ড দেন নির্ধারিত চিকিৎসক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের তথ্যানুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় মুগদা হাসপাতালে নতুন ৪১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। মোট চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬০ জন।
প্রবা/রাই/জেও