গবেষণার তথ্য
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৩ ২২:২২ পিএম
আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৩ ২২:৪৯ পিএম
প্রবা ফটো
দেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরন ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪ শনাক্ত হয়েছে। একেক বছর একেক ধরন বা সেরোটাইপের প্রার্দুভাব বেশি দেখা যায়। এ বছর আক্রান্তদের বেশিরভাগের শরীরে ডেন-২ ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৩ শতাংশ। তবে ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ডেন-২ সবচেয়ে মারাত্মক ধরন নয়, এর চেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ডেন-৩ ধরন।
‘চলমান ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবে ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার কার্যকারিতা এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ নির্ধারণ’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘সোসাইটি ফর মেডিকেল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশ’ এবং ‘ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ’ যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণা করেছে। রবিবার (১ অক্টোবর) গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
এই তথ্য এমন দিন প্রকাশ করা হলো, যেদিন দেশে ডেঙ্গু শনাক্তের পর থেকে এ পর্যন্ত এক বছরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর আগের সব হিসাব টপকে গেল চলতি বছর। তিন মাস বাকি থাকতেই চলতি বছরে এ রোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেল। এর আগে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ২৮১ জনের।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬৮ জন আক্রান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- ডেঙ্গু পিসিআর (পলিমার চেইন রিঅ্যাকশন) পজিটিভ রোগীর মধ্যে ৬৩ জন (৯২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, প্রায় ৯৩ শতাংশ) রোগীর দেহে ডেন-২ সেরোটাইপ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৪ জন রোগীর দেহে ডেন-৩ সেরোটাইপ এবং ১ জন রোগীর দেহে ডেন-২ ও ডেন-৩ উভয় সেরোটাইপ পাওয়া গেছে।
গবেষণায় বলা হয়, এক দিন থেকে সাত দিনের জ্বরে আক্রান্ত মোট ১৯৭ জন ডেঙ্গু রোগীর এনএস-১, ডেঙ্গু এন্টিবডি ও ডেঙ্গু পিসিআর পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে ৬৮ জন (৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ) রোগীর দেহে পিসিআর পদ্ধতিতে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। যাদের মধ্যে ২৮ জন অর্থাৎ ৪১ শতাংশ রোগীর ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে। যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ দেখে ডেঙ্গু হয়নি ভেবে অনেকেই বিষয়টি অবহেলা করেন। পরবর্তীতে ডেঙ্গু বিষয়ক নানা জটিলতায় আক্রান্ত হন। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হলেও অনেক সময় চিকিৎসকদের পক্ষে রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয় না। আবার অনেকেই জ্বর এলে শুরুতে হালকাভাবে নেয়। অনেকে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয় না। যখন হাসপাতালে রোগী আসে, তখন শক সিনড্রোমে চলে যায়। চিকিৎসকের করার কিছু থাকে না। ফলে ডেঙ্গু সন্দেহ হলে শুধু ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফলাফলের ওপরে নির্ভর না করে রোগীর শারীরিক লক্ষণের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু সেরোটাইপ-২ সংক্রমণের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ডেন-৩ সেরোটাইপ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেলেও এ বছর এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি গবেষণা হয়েছে, সব ক্ষেত্রে ডেন-২ সেরোটাইপ বেশি পাওয়া গেছে। চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে অধিক সংখ্যায় ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার পেছনে এটি একটি কারণ হতে পারে।
মানবদেহে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করতে ডেঙ্গু পিসিআর পরীক্ষা একটি সর্বজনীন পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ডেঙ্গু সন্দেহ করে প্রাথমিকভাবে শুধু ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। কিছু ক্ষেত্রে রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ উদ্যোগে ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষা করে থাকে। ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার কারণ সর্ম্পকে গবেষকরা ডেঙ্গুর সহায়ক পরীক্ষা হিসেবে সিবিসি, ডেঙ্গু এন্টিবডি, ডেঙ্গু পিসিআরসহ অন্যান্য পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন।
এই গবেষণার মূল গবেষক ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রুখসানা রায়হান। তার সঙ্গে ছিলেন ‘সোসাইটি ফর মেডিকেল ভাইরোলজিস্টস, বাংলাদেশর সভাপতি ডা. জুলফিকার মামুন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদুর রাহমান খান।
ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার কারণ সর্ম্পকে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে যারা দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই ডেঙ্গুর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। আর ডেঙ্গুর সেরোটাইপ-২ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও ডেঙ্গু এনএস-১ নেগেটিভ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তাই ডেঙ্গুর সহায়ক পরীক্ষা হিসেবে সিবিসি, ডেঙ্গু এন্টিবডি, ডেঙ্গু পিসিআর করা দরকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, ডেঙ্গুর চরিত্র বদলের জন্য তাৎক্ষণিক ডায়াগনোসিসে কিছুটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যেমন- ডেঙ্গু টেস্টে নেগেটিভ ফলাফল আসছে। উপসর্গও ডেঙ্গুর মতো না। কিন্ত হঠাৎ করে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। এতে রোগীরা যেমন বুঝে উঠতে পারছে না, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও বিভ্রান্তি পড়ছেন। এই দুইয়ের মাঝে থেকে কিছু রোগীর জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু হেমোরজিক ফিভার হচ্ছে। হঠাৎ করে শরীরে ফ্লুইড লস তথা রক্তের জলীয় অংশ কমে যাচ্ছে। রোগী শকে চলে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর চরিত্রে কারণের এমনটা হচ্ছে- সেটি নিয়ে গবেষণা দরকার।
ডেঙ্গুতে প্রাণহানি হাজার ছাড়াল
অক্টোবরের প্রথম দিনই ডেঙ্গুতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৬ জনের মৃত্যু হলো। এদিন আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৮৮২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২ লাখ ৬ হাজার ২৮৮।
রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত বছর সারা দেশে ৬২ হাজার ৩৮২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, যার মধ্যে মারা যান ২৮১ জন। চলতি বছরের আগে সেটিই ছিল দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সর্বোচ্চ হিসাব। তবে ২০১৯ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। সেবার ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ চড়া হয়নি। তবে ২০২১ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং মারা যান ১০৫ জন।
সদ্য বিদায়ী সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মাসে আক্রান্ত হয়েছে ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। এর আগের মাসে মারা যান ৪৩২ জন এবং আক্রান্ত হন ৭১ হাজার ৯৭৬ জন। জুলাইয়ে আক্রান্ত হন ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন এবং ২০৪ জনের মৃত্যু হয়। জুনে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৯৯৬ জন এবং মারা যান ৩৪ জন। মে মাসে ১ হাজার ৩৬ এবং এপ্রিলে ১৪৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এ দুই মাসে দুজন করে মারা যান। মার্চে ১১১ জন আক্রান্ত হলেও কেউ মারা যাননি। ফেব্রুয়ারিতে আক্রান্ত হন ১৬৬ জন এবং মারা যান ৩ জন। জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন আক্রান্ত হন ও ৬ জনের মৃত্যু হন।
আরও ১৭ মৃত্যু
রবিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৮টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ১৭ জনের মধ্যে ঢাকার ৯ জন এবং ঢাকার বাইরের ৮ জন। নতুন শনাক্তদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬২৯ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২৫৩ জন।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৯ হাজার ৩৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ৩ হাজার ১২০ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ হাজার ২৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৫ হাজার ২৮৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৮৩ হাজার ৮৫১ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৪৩৭ জন।
আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯২৫ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৮০ হাজার ৮৩ জন এবং ঢাকার বাইরের ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৪২ জন।