রাজবংশী রায়
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৩ ০১:০৭ এএম
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩ ১২:২১ পিএম
ডেঙ্গুতে শিশুদের আক্রান্তের হার বাড়ছে। এক শয্যায় চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে একাধিক শিশুকে। বৃহস্পতিবার মিডফোর্ড হাসপাতাল থেকে ছবিটি তুলেছেন আলী হোসেন মিন্টু
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ আগাম যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল চলমান পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর আগে জুলাইয়ের এই সময় পর্যন্ত কখনও এত আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৪৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭৫৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন আর মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, ডেঙ্গু সংক্রমণের শীর্ষে রয়েছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা। আক্রান্ত রোগীর ১৩ শতাংশ এ এলাকার বাসিন্দা। সারা দেশের আক্রান্ত রোগীর ৩৮ শতাংশ রাজধানী ঢাকার সাত ও উপকণ্ঠের একটি এলাকার বাসিন্দা। অর্থাৎ এ আট এলাকা ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে।
আর চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। এ হাসপাতালে ২৪ শতাংশ রোগী ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তের ৭৬ শতাংশ চিকিৎসা নিয়েছেন ঢাকার ১৬ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগটি মৌসুমি রোগ বলে মনে করা হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর ধারাবাহিক প্রকোপ লক্ষ করা যাচ্ছে। ভাইরাসটিও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা সেদিকে নজর না দেওয়ার কারণেই ভাইরাসটি মারাত্মক হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আট হটস্পট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের ১৩ শতাংশ যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা। এরপর দ্বিতীয় স্থানে থাকা মুগদার ৫ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তৃতীয় স্থানে থাকা উত্তরা ও জুরাইন এলাকায় ৪ শতাংশ করে মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর কদমতলী, মোহাম্মদপুর, মানিকনগর ও রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ শতাংশ করে মানুষ। অর্থাৎ সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের ৩৮ শতাংশই এ আট এলাকার বাসিন্দা। দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা। আর ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ৭৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ ঢাকার বাসিন্দা। আর ঢাকার বাইরের ২২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
৭৬ শতাংশ রোগী ১৬ হাসপাতালে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। সারা দেশে ভর্তি রোগীর মোট ২৪ শতাংশ এ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ শতাংশ রোগী। আর ৯ শতাংশ ভর্তি হয়েছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের মধ্যে এরপর পর্যায়ক্রমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩ শতাংশ, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ২ শতাংশ করে রোগী ভর্তি হয়েছেন। ১ শতাংশ করে রোগী ভর্তি হয়েছেন বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সারা দেশে আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন রাজধানীর ৯ সরকারি হাসপাতালে।
বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আজগর আলী হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ৪ শতাংশ করে, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩ শতাংশ, সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং গ্রীন লাইফ হাসপাতালে ২ শতাংশ করে রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর ১৯ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন রাজধানীর ৭ বেসরকারি হাসপাতালে। অর্থাৎ রাজধানীর ১৬ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তের ৭৬ শতাংশ চিকিৎসা নিয়েছেন।
আক্রান্তের ৭১% ও মৃত্যু ৭০% জুলাইয়ে
জুলাইয়ের রোগীদের মধ্যে ৭১ শতাংশই জুলাই মাসের ২০ দিনে আক্রান্ত হয়েছে। জুনে ২৮ শতাংশ, মে মাসে ৭ শতাংশ, এপ্রিলে ৫ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ২ শতাংশ রোগী ডেঙ্গু সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্তের মধ্যে জুলাই মাসের ১৮ দিনে মারা গেছে ৬৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ আর নারী ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ২৭ শতাংশের বয়স ১৯ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। আর ১০ থেকে ১৮ বছর এবং ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সি ১৮ শতাংশ করে। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সি ১০ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সি ৯ শতংশ, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সি ৭ শতাংশ, ১ থেকে ৪ বছর বয়সি ৬ শতাংশ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সি ৪ শতাংশ।
মৃত্যু বেশি শক সিনড্রোমে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শক সিনড্রোম’-এ বেশি মৃত্যু হচ্ছে ডেঙ্গুতে। অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তির রক্তচাপ অতি দ্রুত কমে যায়, রক্তে অণুচক্রিকার পরিমাণ কমে যায় এবং রোগীর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ে, রোগী অজ্ঞান হয়ে যান। এই বছর রোগীদের মধ্যে শক সিনড্রোম বেশি দেখা যাচ্ছে।
অপরদিকে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সম্প্রতি সীমিতসংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুর ডেন-২ ধরনে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ৬২ শতাংশ রোগীই ডেঙ্গুর ডেন-২ ধরনে আক্রান্ত। আর ৩৮ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন ডেন-৩ ধরনে।
নজর দেননি সংশ্লিষ্টরা : অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সিটি করপোরেশন মশা মারা আর স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসা সামলানোর দায়িত্ব পালন করছেন। তারা পরস্পরকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মশা দমনে দেশজুড়ে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি এখন মশা দমনে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা আছে কি না, তা কারও জানা নেই। আর স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত ভাইরাসজনিত রোগ ডেঙ্গু নিয়ে কোনো কার্যকর গবেষণা করতে পারেনি। এমনকি নজরদারিও নেই। আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, তাদের তথ্য আসছে। এর বাইরেও অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের তথ্য কোথাও নেই। কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হলেও সেদিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণে মৌসুমের আগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডেঙ্গু রূপ বদল করে ফেললেও স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশন রূপ বদল করতে পারেনি। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তারা অনেকটা গতানুগতিক ব্যবস্থা নিয়েছে। এ কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া দরকার, তারা সেটি করছে না বলে মনে করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। গত দুই বছরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ডেঙ্গু এভাবে ছড়াতে থাকলে আগামীতে গ্রামাঞ্চলেও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সুতরাং শহরের পাশপাশি গ্রামেও সমানতালে নজরদারি বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা করোনার পরিস্থিতির মতো হলে সামাল দিতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। সুতরাং সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখবেন। মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার করতে হবে।