রংপুর মেডিকেল
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ০৯:৫৯ এএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩ ১৩:০৮ পিএম
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে শয্যা দিতে না পারায় বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রবা ফটো
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড যেন এক দুর্ভোগের নাম। ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে এ ওয়ার্ডে। শয্যা না পেয়ে ওয়ার্ড ও বারান্দায় বিছানা পেতে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা। ভাঙাচোরা ও দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেট নিয়ে রোগী ও স্বজনদের রয়েছে সীমাহীন ভোগান্তি। মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে তাদের ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নানা সংকটের মাঝেও সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উত্তরের মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল রমেক হাসপাতাল। জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতাল থাকলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেককে এ হাসপাতালে আসতে হয়। হাসপাতালটিতে মেডিসিন বিভাগের ছয়টি ইউনিট রয়েছে। এতে সাধারণ শয্যা ১৯৪টি ও পেয়িং শয্যা ২৯টি। মোট ২২৩টি শয্যা থাকলেও হাসপাতালে গড়ে ছয় শতাধিক রোগী চিকিৎসাধীন থাকে। বাধ্য হয়ে অর্ধেকের বেশি রোগী মেঝে ও বারান্দায় বিছানা পেতে কোনো রকম চিকিৎসা নিচ্ছে। মেডিসিন বিভাগে দুজন অধ্যাপক, পাঁচজন সহযোগী অধ্যাপক, ১১ জন সহকারী অধ্যাপকসহ পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছেন না। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়ায় মেডিসিন বিভাগে আলাদা কর্নার করায় শয্যা সংকট প্রকট হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় মেডিসিন ওয়ার্ড। মূল সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাতের ডানে ভবনের সরু বারান্দা দিয়ে যেতে হয় সেখানে। স্ট্রেচারে রোগী নিয়ে আসা-যাওয়াসহ সরু বারান্দায় মানুষের চলাচলে সব সময় ভিড় লেগে থাকে। ভিড় ঠেলে মেডিসিন বিভাগের গেটে আসতেই তিনটি ইউনিটের সম্মুখে বারান্দায় রোগী ও স্বজনদের কারণে তিলধারণের ঠাঁই নেই। পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় অত্যধিক গরমে বারান্দায় চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এ ছাড়া লোকজনের কথাবার্তা ও চলাচলে সারাক্ষণ কোলাহল লেগেই থাকে ওয়ার্ডের বারান্দায়।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী থেকে আসা রোগীর স্বজন মরিয়ম বেগম বলেন, ‘মোর স্বামীর প্রেশার থ্যাকি থ্যাকি বাড়ি যায়, মাথা ঘোরে আর অসুস্থ হয়া পড়ে। কুড়িগ্রামোত ডাক্তাররা রংপুরোত চিকিৎসা নেওয়ার জন্তে পাটে দিল। অ্যালা ওয়ার্ডের ভেতরোত বিছানা খালি নাই। বাড়ি থ্যাকি আনা চট বারান্দাত বিছিয়া চিকিৎসা নেওছি। ডাক্তার রোগীক দেখবার সময় পায় না। এর মধ্যে গরমোত কাহিল অবস্থা। সারা দিন-রাইত হাতপাখা দিয়া রোগীক বাতাস করা নাগে।’
নগরীর নজিরেরহাটের রিয়া আক্তার বলেন, আমার বাবা স্ট্রোক করলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু শয্যা না থাকায় মেসিডিন বিভাগের ইউনিট-২-এর মেঝেতে রেখে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। মানুষের আসা-যাওয়া ও কথাবার্তার কারণে বাবাকে নিয়ে বড়ই অসুবিধায় আছি।
এক রোগীর স্বজন আমজাদ হোসেন বলেন, মেডিসিন ওয়ার্ডের টয়লেট ব্যবহার করা যায় না। চারদিকে নোংরা। হাসপাতাল থেকে সরকারের দেওয়া বিনামূল্যের ওষুধও পাওয়া যায় না। পুরো বিভাগের মানুষের জন্য বড় এ হাসপাতালে আমরা রোগী নিয়ে এসে চরম অবহেলার শিকার হচ্ছি।
মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. জামাল উদ্দিন মিন্টু বলেন, দাঁত, চোখ ও সার্জারি ছাড়া সব ধরনের চিকিৎসা হয় মেডিসিন ওয়ার্ডে। এ ছাড়া ব্রেন, স্ট্রোক, হার্ট, কিডনিসহ বিভিন্ন বিভাগের রোগী যখন চিকিৎসার জন্য শয্যা পায় না, তখন তাদেরও পাঠানো হয় এ বিভাগে। তাই সব ওয়ার্ডের চেয়ে এখানে রোগীর চাপ বেশি। এর মধ্যেও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাহফুজার রহমান বলেন, হাসপাতালের যে অবকাঠামো রয়েছে তা ৫০০ শয্যার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরে একে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আমাদের জনবল কাঠামো, চিকিৎসার ব্যবস্থা, ওষুধপত্র, বেড ক্যাপাসিটি, টয়লেট ব্যবস্থাসহ সবকিছু ৫০০ শয্যারই রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এক হাজার শয্যার হাসপাতাল বলা হলেও এখানে আড়াই হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকে। এর মধ্যে আমার ওয়ার্ডে পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক রোগী সব সময় চিকিৎসাধীন থাকে। এত রোগীকে চিকিৎসক-নার্সরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ ছাড়া বারান্দা, মেঝে ও চলাচলের রাস্তায় থাকা রোগীর কাছে গিয়ে তার পুরো সমস্যা জানা, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। এর পরও আমরা সর্বোচ্চটা দিয়ে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছি।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইউনুস আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মেডিসিন বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় একটু দুর্ভোগ রয়েছে। এর পরও আমরা রোগীদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নতুন ভবন তৈরি হলে সমস্যা সমাধান হবে বলে আশা করছি।’