ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৩ ১৬:০৮ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩ ১৮:৩২ পিএম
ছবি : আলী হোসেন মিন্টু
রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এতে অস্থির হয়ে উঠছে শিশু হাসপাতালের পরিবেশ। চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি সেখানে দেখা দিয়েছে শয্যার সংকট।
এদিকে মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। শিশু রোগীদের পরিবারের অভিযোগ, শয্যা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শিশু হাসপাতালে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। এদিন সকাল ৮টা থেকে ছেলেকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন হাজেরা বেগম। বার বার বমিতে ছেলে হাসনাইনের শরীর এতটাই ক্লান্ত, হাঁটারও শক্তি পাচ্ছে না। সকালেই জানতে পারেন সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলে তার জন্য শয্যা মিলে বলে জানান হাজেরা।
পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হাসনাইন। হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর এলে হাসপাতালে পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। হাজেরা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইব্রাহিমপুর থেকে ঢাকায় আসেন তারা। সকালে শয্যার জন্য সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শয্যা পেয়েছেন বিকাল ৪টার পর।
হাসনাইনের বাবা চা-দোকানি আবুল হাসেম বলে, ‘আমার ছেলে বার বার বমি করছে। ব্যাগ নিয়ে, বাচ্চা নিয়ে সকাল থেকে অপেক্ষা করেছি। বাচ্চার অবস্থাতো খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’
দীর্ঘসময় অপেক্ষার কথা জানান পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা সোনিয়া বেগম। পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে রাবেয়া বসরীকে বিকালে হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি। তবে এর আগে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে।
তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২টায় এসেছি। এখান থেকে বলা হয় শয্যা নেই। অন্য হাসপাতালে যান। ফোনে অন্য হাসপাতালে খবর নিয়ে জানলাম সেখানেও একই অবস্থা। অনেক কষ্টের পর বিকালে জায়গা পেলাম। এদিকে বাচ্চার কী অবস্থা জানি না। ব্লাড টেস্টের রিপোর্টও পাইনি। এখনও ডাক্তার দেখেনি। সময়টা তো অপেক্ষাতেই বেশি গেছে।’
বুধবার লালবাগ থেকে পাঁচ বছর বয়সি ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে ওসমান গনিকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন এনামুল হক এনা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অসুস্থ শিশুকে নিয়ে বারান্দায় অপেক্ষার পর নিচ তলার দুই নম্বর ওয়ার্ডে শয্যা পান বলে জানান তিনি।
বলেন, মঙ্গলবার ছেলের অবস্থা খারাপ গেছে, আজ (গতকাল) আরও বেশি ক্রিটিক্যাল। মনটা খারাপ। ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসছি। কিন্তু বাচ্চাটাই সুস্থ হচ্ছে না।’ হাসপাতালে তিন দিন ধরে ছেলে অর্পণকে নিয়ে আছেন বাবা আশরাফুল হোসেন।
তিনি বলেন, গত দুই দিনে রোগীর চাপ বেশি দেখতে পাচ্ছি এখানে। নার্সরাও আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছেন। ডাকলে আসতে একটু দেরি হয়। তবে এই হাসপাতালে শিশুর সেবাটা ভালো হয় অন্য হাসপাতালের তুলনায়। শয্যা সংকট হওয়াটাই স্বাভাবিক।
হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা জানান, হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ৪২ শয্যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আজ এখনও সেখানে শয্যা খালি আছে। সংকট নেই, তবে মাঝে মাঝে রোগীর চাপ বেড়ে গেলে একটু সংকট তো হয়ই।
হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম বলেন, এখন পর্যন্ত এ হাসপাতলে ৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৫ শিশু। হাসপাতালে এখনও কোনো শয্যা সংকট নেই। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত আর কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের শয্যা কখনও খালি থাকে না। একটা খালি হলে অন্য এক রোগীকে ভর্তি করাই। তবে আমরা অন্যান্য রোগীদের থেকে ডেঙ্গু রোগীদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমারা প্রাণপণে চেষ্টা করছি একজন রোগীও যেন ফিরে না যায়।
আমাদের ২ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়াও আইসিইউ, সিসিইউসহ বিভিন্ন জায়গায় একটু ক্রিটিক্যাল ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে তাই অপেক্ষা করতে হয়। ফাঁকা হলে তারপর দ্রুত অন্য একজনকে সেই শয্যায় তুলি।