ফয়সাল খান
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৩ ১০:২৮ এএম
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৩ ১৫:৪৩ পিএম
ফাইল ফটো
বদলে গেছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার গতিপ্রকৃতি। এ মশা শুধু দিনেই নয়, রাতেও কামড়ায়। এমনকি স্বচ্ছ পানির পাশাপাশি এডিস মশা ময়লা পানি ও সমুদ্রের নোনা পানিতেও ডিম পাড়ে এবং জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশারের গবেষণায় এমন তথ্য এসেছে।
চলতি বছরের মধ্যে গতকাল শনিবার সর্বোচ্চ ৮২০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২ জন মারা গেছে। এ নিয়ে এ বছর ১২ হাজার ১১৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ৬৭ জন।
গবেষক কবিরুল বাশার শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে আমরা পরিষ্কার পানির কথা জানি। আমি নিজেও এটি সব সময় বলে এসেছি। কিন্তু আমাদের গবেষণায় আমরা পেয়েছি এডিস মশা ড্রেনের ময়লা পানি এমনকি সমুদ্রের নোনা পানিতেও ডিম পাড়ে এবং জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে।
তিনি বলেন, এক সেন্টিমিটার পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও আমরা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছি। ইতঃপূর্বে আমরা জানতাম এডিস মশা শুধু দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকালে এবং বিকালে কামড়ায়। কিন্তু আমাদের গবেষণায় সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা মশার পেছনে, ফল শূন্য
কবিরুল বাশার বলেন, আমাদের ল্যাবরেটরি এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আমরা পেয়েছি এডিস মশা রাতেও কামড়ায়। তবে রাতের বেলায় কামড়ানোর হার কম। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মানুষের আচরণের কারণ এই মশা নিজেকে পরিবর্তিত করে নিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃতিতে এডিস মশার ঘনত্ব যেহেতু খুব বেশি নয় আর আমরা এটাও জানি না কোন এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করছে, কোনটি নয়, তাই আমাদের রাতে বা দিনে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনোভাবেই এডিস মশা কামড়াতে না পারে।
এক দিনে রেকর্ড আক্রান্ত
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে এক দিনে রেকর্ড ৮২০ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৬০৩ জনকে। আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ২১৭ জনকে। এ নিয়ে চলতি মাসের আট দিনে দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ১৪০ জন।
শনিবার ডেঙ্গু আক্রান্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসের আট দিনেই ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। এ নিয়ে চলতি বছর এ রোগে ৬৭ জনের মৃত্যু হলো। শনিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ২ হাজার ৫০২ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ঢাকার ৫৩ হাসপাতালে ভর্তি আছে ১ হাজার ৭৭৩ জন। ঢাকা ছাড়া অন্য বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগী ৭২৯ জন। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিভাগে এখন রোগী যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যু। এরপরই বা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।
১৫ লাখ টাকা জরিমানা
রাজধানীতে বিভিন্ন স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় ১৭ মামলায় মোট ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে শনিবার। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর জাপান গার্ডেন সিটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, মশক নিধন অভিযানে আমি কোথায় যাব কেউ কিছুই জানেন না। আগে থেকে জানিয়ে গেলে সেখানে সবকিছু পরিষ্কার করা থাকে। তাই প্রকৃত অবস্থা দেখতে কাউকে না জানিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে আকস্মিক পরিদর্শনে যাব। এ ক্ষেত্রে আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাব এবং ব্যবস্থা নেব। শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় জাপান গার্ডেন সিটির কয়েকটি বহুতল ভবনের বেজমেন্ট ঘুরে দেখেন তিনি। তিনটি ভবনের বেজমেন্টে গিয়ে প্রতিটিতেই গাড়ি ধোয়ার পর জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা দেখতে পান। জীবন্ত মশাও সেখানে ওড়াউড়ি করছিল।
মেয়র বলেন, ভবনের ভেতরে জমে থাকা পানি সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করবে না। এসব ভবনে আমাদের কর্মীরা ঢুকতে পারে না। শুধু এই এলাকা না, ঢাকার অনেক ভবনে, বাড়িতে আমাদের কর্মীদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। অন্যান্য জায়গার চেয়ে বাসাবাড়ির ভিতরে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা বেশি জন্মে বলে গবেষণার বরাতে জানান তিনি।
৩০ ওয়ার্ডে ডিএসসিসির চিরুনি অভিযান
এডিস মশা নিধনে এবার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি ওয়ার্ডে তিন দিনের বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। আজ রবিবার থেকে এ অভিযান শুরু হচ্ছে। ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বিষয়টি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কর্মসূচিতে ৯ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন সকালে ১৩ জন এবং বিকালে ১৩ জন কর্মী মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। একই সঙ্গে এডিস মশার উৎসস্থল নির্মূলে বিশেষ কার্যক্রমও চালানো হবে। কাউন্সিলররা জনগণকে সচেতন করার জন্য মাইকিং কার্যক্রমের ব্যবস্থা করবেন। কাউন্সিলরদের সঙ্গে সমন্বয় করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ।