ঢাকা মেডিকেল
মো. শাহজাহান
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৩ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩ ১১:২০ এএম
ফাইল ফটো
ভাবা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমআরআইর মতো অতি জরুরি স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই! দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো এমআরআই মেশিন সচল নেই।
হাসপাতালের দুটি এমআরআই মেশিনই নষ্ট। একটি নষ্ট হয় এক বছরের বেশি আগে, আরেকটি পাঁচ মাস ধরে নষ্ট। তারপর থেকেই বন্ধ এমআরআইর মতো অতি জরুরি পরীক্ষা। ফলে বেশি টাকা খরচ করে জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের এমআরআই করাতে হচ্ছে বাইরে থেকে। অনেক চেষ্টা করেও মেশিন দুটি সারানো সম্ভব হচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ে বৈঠক, বারবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা, এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজের চেষ্টার পরও ঠিক করা যায়নি এমআরআই মেশিন- এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে জটিলতায় আটকে আছে মেশিনের ‘সার্ভিসিং’। তবে কী সেই নীতিগত জটিলতা বা কত দিনে সারানো সম্ভব হবে এমআরআই মেশিন- তা স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি পরিচালক।
নোয়াখালী থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাবা মুমিনুল্লাহকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন ছেলে মো. রুবেল। স্ট্রোক করার পর মুমিনুল্লাহ হাঁটা-চলা করতে পারেন না। বিছানা থেকে উঠতেও পারেন না তিনি। সিটি স্ক্যানসহ কয়েকটি পরীক্ষা করার পরও রোগ নির্ণয় না হওয়ায় এমআরআই পরীক্ষা করাতে পাঠান চিকিৎসক। তবে এমআরআই পরীক্ষা করাতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় রুবেলকে। প্রায় পাঁচ মাস ঢাকা মেডিকেলে এমআরআই হয় না, হাসপাতালের দুটি এমআরআই মেশিনই নষ্ট। ফলে বাইরের ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই রুবেলের মতো শত শত রোগীর স্বজনদের।
গত ২৯ মে ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনের এমআরআই পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটে রুবেলের সঙ্গে প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিবেদকের কথা হয়। রুবেল বলেন, কম খরচে বাবার চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসেছি। কিন্তু এখানেও শান্তি নেই। এখানে এমআরআই মেশিন নষ্ট। দেশের এত বড় হাসপাতালের এই অবস্থা, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
তিনি বলেন, ‘এই পরীক্ষা করাতে বাইরে নিতে হবে বাবাকে। উনি নড়াচড়াই করতে পারেন না। ওনাকে তুলে নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে পরীক্ষা হলে তিন হাজার টাকা লাগত। এখন বাইরে নিলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াসহ প্রায় ৮ হাজার টাকা লাগবে। আমরা গরিব মানুষ। এত টাকা পামু কই?’
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছেন বিক্রমপুর থেকে আসা কোহিনূর বেগম। তার ছেলে জনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এমআরআই পরীক্ষা করানোর জন্য প্রায় ৫-৬ জন মিলে মাকে অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত নিয়েছি। লালবাগের ইবনে সিনাতে পরীক্ষা করিয়েছি। গাড়ি ভাড়াসহ প্রায় ৮ হাজার টাকা লেগেছে। ঢাকা মেডিকেলে এই পরীক্ষা করাতে পারলে অনেক সুবিধা হতো। টাকাও কম খরচ হতো আবার এই গরমে দুর্ভোগও কম হতো।
মুমিনুল্লাহ ও কোহিনূরের মতো প্রতিদিনই শত শত রোগীকে মেডিকেল থেকে বাইরে যেতে হচ্ছে এমআরআই পরীক্ষা করানোর জন্য। এতে একদিকে যেমন টাকা গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ, অন্যদিকে পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দেশের শীর্ষ সরকারি এই হাসপাতালে প্রতিদিন রাজধানীর বাইরে থেকে শত শত রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু এখানে রোগ নির্ণয়ের এমআরআই মেশিন নষ্ট প্রায় পাঁচ মাস। মেশিনটি সারাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি তাদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দুটি এমআরআই মেশিন কেনা হয় ২০১৬ সালে। এর থেকে প্রতিদিন দুই শিফটে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ রোগীর পরীক্ষা করা হতো। খরচ পড়ত ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। বেসরকারি ক্লিনিকে খরচ পড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। এক বছরের আগে নষ্ট হয়ে যায় একটি মেশিন, অন্যটি পাঁচ মাস আগে।
নষ্ট এমআরআই মেশিন সারাতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে- এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি রেডিওলজি বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে হাসপাতাল পরিচালকের নিষেধাজ্ঞা আছে। আপনি পরিচালক স্যারের সঙ্গে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো জায়গায় এমআরআই মেশিন নেই- এটা খুবই কষ্টদায়ক। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি নিজেই এটা মানতে পারি না। ২০১৬ সালে দুটি মেশিন কেনা হয়। একটি মেশিন এক বছরের অধিক এবং অপর একটি পাঁচ মাস আগে নষ্ট হয়েছে। পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি ছিল, যা শেষ হয় গেছে। তাই কোম্পানি এটা মেরামত করতে চাচ্ছে না। মেশিন কেনার সময় কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তি নিয়ে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় মেশিন এখনও মেরামত হয়নি। একটি মেশিন মেরামত হবে। আর একটি কেনার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু কখন এটা বাস্তবায়ন হবে, নির্দিষ্ট সময় বলতে পারছি না। প্রায় দুই মাস আগে এই নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকের প্রেক্ষিতে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।’
পরিচালক আরও বলেন, ‘এই মেশিনগুলো সচল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আমি নিজেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কমপক্ষে পাঁচবার দেখা করেছি। মন্ত্রীও চেষ্টা করছেন। কিন্তু নীতিগত জটিলতার কারণে সমাধান হচ্ছে না।’ তিনি দাবি করেন, শিগগিরই এ বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। একটা নীতিগত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যে জন্য কোম্পানিও কাজ করতে চাচ্ছে না। আর নীতিগত জটিলতা সমাধান করতে মন্ত্রণালয়কে বেগ পেতে হচ্ছে। সরকার যে নীতিমালা করেছে, সেটা কোম্পানি মানতে চায় না। কোম্পানির সঙ্গে মেশিন কেনার চুক্তির বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি তা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং নীতিগত জটিলতার বিষয়টিও খোলাসা করতে চাননি।