× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাম শনাক্তের রিপোর্ট মিলবে ২০ মিনিটে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশু। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশু। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকার একটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের সামনে হাম শনাক্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন এক শিশুর বাবা। জানা গেল, সকালে নমুনা দিয়েছিলেন, কিন্তু রিপোর্ট পেতে লাগবে অন্তত একদিন। খরচ প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। রাজধানীর বাইরে হলে সময় আরও বেশি লাগত।

অথচ দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রোগ মাত্র ২০ মিনিটে শনাক্ত করা সম্ভব, খরচও মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্ট (বিআরআইসিএম) হাম শনাক্তে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর একটি আরটি-ল্যাম্প কিট উদ্ভাবন করেছে। যেটি দিয়ে এটি এমন করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওই কিট উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে তাদের। এ বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পরিপূর্ণ প্রস্তাবনাও পাঠানো হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উদ্যোগটি এখনও মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংক্রামক, ভাইরাসজনিত এ রোগ সময়মতো শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করা না গেলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে হাম শনাক্তে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় আরটি-পিসিআর পরীক্ষাÑ যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে স্বীকৃত। তবে এ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি, আধুনিক পরীক্ষাগার ও দক্ষ জনবল। ফলে দেশের অধিকাংশ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এই সুবিধা নেই। নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ল্যাবে পাঠাতে হয়। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং ব্যয় দুটোই বাড়ে।

এই বাস্তবতায় আরটি-ল্যাম্প প্রযুক্তিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। আরটি-ল্যাম্প বা রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন লুপ-মিডিয়েটেড আইসোথার্মাল অ্যাম্পলিফিকেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান শনাক্ত করা যায় তুলনামূলক সহজ পদ্ধতিতে। এতে আরটি-পিসিআরের মতো ব্যয়বহুল থার্মাল সাইক্লারের প্রয়োজন হয় না; সাধারণ তাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রেই পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিআরআইসিএমের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফল পেতে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে একদিন সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে নমুনা পরিবহন ও ল্যাবের চাপের কারণে সময় আরও বেড়ে যায়। বিপরীতে আরটি-ল্যাম্প পরীক্ষায় ২০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যেই ফল পাওয়া সম্ভব। সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি ৯০ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর, যা প্রাথমিক রোগ শনাক্তের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো এ পরীক্ষায় খরচ হয় কম। বর্তমানে একটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় ব্যয় হয় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ থেকে ৪ হাজার টাকা। বিআরআইসিএমের প্রস্তাবিত দেশীয় আরটি-ল্যাম্প কিট ব্যবহার করলে সেই ব্যয় কমে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ একজন রোগীর ক্ষেত্রে খরচ কমবে প্রায় ৫০ গুণ।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বৃহৎ পরিসরে এ প্রযুক্তি চালু করা গেলে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং পরীক্ষার আওতায় আরও বেশি মানুষকে আনা সম্ভব হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমদানি-নির্ভর ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে। হাম শনাক্তকরণ কিট স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিও কমবে। 

এ বিষয়ে সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মাইক্রোবাইলোজিস্ট অধ্যাপক ডা. কেএম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি আমরা দেখেছি। তাই দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।’ 

তিনি বলেন, বিষয়টি এখন কেবল একটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের প্রশ্ন নয়; এটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেরও বিষয়। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের যে লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে, এই প্রকল্প তার একটি পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে।’ তার ভাষায়, ‘সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’ 

এদিকে প্রশ্ন উঠেছেÑ প্রযুক্তি প্রস্তুত, উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তবুও কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জটিলতায় প্রস্তাবটি আটকে আছে। কিছু গবেষকের অভিযোগ, অনেক সময় দেশীয় উদ্ভাবনের তুলনায় আমদানি-নির্ভর সমাধান বেশি গুরুত্ব পায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আরটি-ল্যাম্প কোনোভাবেই আরটি-পিসিআরের পূর্ণ বিকল্প নয়; বরং দ্রুত স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক রোগ শনাক্তের কার্যকর মাধ্যম। সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে পরে প্রয়োজন হলে আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে।’

ভাইরোলজিস্ট মোহাম্মদ মামুন আলম বলেন, ‘মহামারি বা প্রাদুর্ভাবের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত রোগী শনাক্ত করা। আরটি-ল্যাম্প সেই কাজটি অনেক দ্রুত করতে পারে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এটি বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের প্রশ্ন নয়; এটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেরও বিষয়। দ্রুত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং উৎপাদন পরিকল্পনা নেওয়া গেলে দেশের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। দেশের লাখো শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমানোর এই সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা