প্রতীকী ছবি
‘যার নুন খাই তার গুণ গাই’ কিংবা ‘নুন খেয়ে নিমকহারামি করা’ বাংলা ভাষায় লবণ নিয়ে এমন নানা প্রবাদ প্রচলিত আছে। সাত কন্যার মধ্যে যেজন রাজাকে ‘লবণের মতো’ ভালোবাসতেন, তাকে ভুল-বুঝে বনবাসে পাঠানোর মতো রূপকথার গল্পও আছে। এসব প্রবাদ ও গল্পে লবণকে ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বর্তমান বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত লবণ এখন আর বিশ্বস্ততার প্রতীক নয়, বরং এটি মানবদেহের জন্য এক নীরব ঘাতক। খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে দেশে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো ভয়াবহ রোগ বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের প্রাণ ঝরছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দিনে সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম লবণ গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১১ গ্রাম লবণ খাচ্ছে, যা নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। গত তিন দশকের ব্যবধানে দেশে অকালমৃত্যুর প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলোর শীর্ষে উঠে এসেছে উচ্চ রক্তচাপ। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে এ রোগটির অবস্থান ছিল ১১ নম্বরে। অথচ ২০২৩ সালের পরিসংখ্যানে এটি প্রথম স্থানে চলে এসেছে। বর্তমানে দেশের প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ খাবারে এই অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার।
লবণ যখন ঘাতক: লবণ মানবদেহের জন্য একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পরিমিত লবণ দেহের জলীয় অংশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে, মাংসপেশির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে এবং রক্তের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ গ্রহণ করলেই তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৭০ হাজার মৃত্যুই সরাসরি উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত বা অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশই অকালমৃত্যু, যেখানে কেবল হৃদরোগেই মৃত্যুর হার ৩৪ শতাংশ।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘লুক্কায়িত লবণ’: চিকিৎসকেরা বলছেন, মানুষ শুধু ভাতের সঙ্গে বা রান্নায় আলাদা লবণ খাচ্ছে না; বরং বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত খাবারের মাধ্যমে অজান্তেই বিপুল পরিমাণ লবণ শরীরে প্রবেশ করছে। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা এখন রীতিমতো উদ্বেগজনক।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের ৪৯ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত খাবার খাচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের এই হার সার্বিকভাবে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৯৭.৩ শতাংশ। এর মধ্যে শিশুদের প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের হার শতভাগ। এ ছাড়া কিশোরদের মধ্যে ৯৯.২ শতাংশ, গ্রামীণ পর্যায়ে ৯৪.১ এবং শহুরে মানুষের মধ্যে ৯৯.১ শতাংশ মানুষ নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাচ্ছে।
প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে থাকা এই ‘লুক্কায়িত লবণ’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ, বিস্কুটসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাদ্যে উচ্চমাত্রার লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম দেওয়া থাকে, যা অধিকাংশ ভোক্তারই অজানা। এতে মানুষ অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ খাচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুল আরেফিন জানান, প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। এজন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অধ্যাপক আরেফিন এই প্রতিবেদককে বলেন, লবণ গ্রহণ কমানোর জন্য রান্নায় কম লবণ ব্যবহার করতে হবে। খাবারের সঙ্গে কাঁচা লবণ খাওয়া পরিহার করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া এবং খাদ্য কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে থাকা পুষ্টিতথ্য যাচাই করার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও সচেতনতার তাগিদ: প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ কমানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল)। ডব্লিউএইচওর প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, ‘খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় এফওপিএল চালু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কৌশল। প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় পুষ্টিতথ্য (লবণ, চিনি ও চর্বির পরিমাণ) দেওয়া থাকলে তা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তা করবে এবং অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ কমাবে।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ অনুযায়ী প্যাকেট খাবারে উপাদানের পরিমাণ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হলেও তা মানছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ ব্যবহার করলেও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিএফএসএর সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ডব্লিউএইচওর মতে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ লবণ, চিনি ও চর্বির অতিরিক্ত ব্যবহার। আমাদের দেশে মানুষ গড়ে প্রায় ১১ গ্রাম পর্যন্ত লবণ খাচ্ছে, অথচ গ্রহণযোগ্য মাত্রা মাত্র ৫ গ্রাম। আমরা শুধু লবণ কম খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচার চালাই। কিন্তু কোনো বিধিতে এমন বলা নেই যে খাবারে ৪-৫ গ্রামের বেশি লবণ থাকা যাবে না; তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা কেবল তেলে ট্রান্সফ্যাট ২ গ্রামের বেশি হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারি”।
অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। সম্প্রতি বিএফএসএ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এক যৌথ সেমিনারে বক্তারা একমত পোষণ করে বলেন, লবণ নামের এই নীরব ঘাতক মোকাবিলায় সরকার, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমসহ সব অংশীজনের সমন্বিত ও কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।