× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাধ্যতামূলক নাকি ঐচ্ছিক ফুড ফর্টিফিকেশন: বাংলাদেশের অনুপুষ্টি নিশ্চয়তায় কোনটি কার্যকর?

অতিথি লেখক : মো. নাঈম জোবায়ের (সিনিয়র ফুড ফর্টিফিকেশন স্পেশালিস্ট, টেকনোসার্ভ)

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৬ পিএম

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:২৬ পিএম

বাধ্যতামূলক নাকি ঐচ্ছিক ফুড ফর্টিফিকেশন: বাংলাদেশের অনুপুষ্টি নিশ্চয়তায় কোনটি কার্যকর?

বাংলাদেশ গত তিন দশকে খাদ্য উৎপাদন ও দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই অগ্রগতির আড়ালে এখনো একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকট রয়ে গেছেমাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট/অনুপুষ্টির ঘাটতি, যা সাধারণভাবে “অদৃশ্য ক্ষুধা বা হিডেন হাংগার” নামে পরিচিত। পেট ভরা, তবু অনুপুষ্টির অভাবএটাই অদৃশ্য ক্ষুধা।

পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণের পরও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের) ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ও প্রাসঙ্গিক জাতীয় তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট করে যে, ফুড ফর্টিফিকেশন কার্যকর হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করে জাতীয় ফুড ফর্টিফিকেশন নীতির ওপর।

ফুড ফর্টিফিকেশন বা ফর্টিফিকেশন কি?

ফর্টিফিকেশন হলো সাধারণ খাদ্যে এক বা একাধিক প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যোগ করার একটি কৌশল, যা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি কমাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলে ভিটামিন-এ ও লবণে আয়োডিন ফর্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনের উদাহরণ। এছাড়া, ফর্টিফাইড চাল সরকার  সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (VWB) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (FFP) বিতরণ করছে। এছাড়াও, বাণিজ্যিকভাবে, ফর্টিফাইড আটা ও ফর্টিফাইড চাল বাজারে এসেছে, যেখানে যথাক্রমে ১০টি ও ৬টি অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যুক্ত আছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির চিত্র

প্রধান খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও বাংলাদেশে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি এখনো উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ (২০১৯২০) অনুযায়ী শিশু ও নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, পাশাপাশি ভিটামিন-এ ও জিঙ্ক ঘাটতি এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।

সূচক

অবস্থা

রক্তস্বল্পতা (৬৫৯ মাস বয়সী শিশু)

প্রায় ১৫%

রক্তস্বল্পতা (প্রজনন সক্ষম নারী)

প্রায় ১৪%

ভিটামিন-এ ঘাটতি

প্রায় ৭% প্রাক্‌-বিদ্যালয়(৩-৫ বছর)  শিশু

জিঙ্ক ঘাটতি

৪৩%+ জনগোষ্ঠী

 

মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ১২ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এই ঘাটতিগুলোর সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে প্রতিবছর বাংলাদেশ বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেযার মধ্যে রয়েছে কম উৎপাদনশীলতা, বাড়তি জনস্বাস্থ্য ব্যয় এবং শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাধা।

জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন: বৈশ্বিক প্রমাণ ও অভিজ্ঞতা

বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায়, ফর্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক হলে এর কার্যকারিতা, পরিসর ও পুষ্টিগত প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। লবণ, আটা, ভোজ্য তেল ও চালের মতো প্রধান খাদ্যে বহু দেশ বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন চালু রয়েছে।

Global Fortification Data Exchange (GFDx)এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনের চিত্র :

খাদ্য

বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন চালু দেশ

লবণ (আয়োডিন)

১৩০+

গমের আটা

৯০+

ভোজ্য তেল

৪০+

ভুট্টার আটা

২০+

চাল

৮+

 

যেসব দেশে ফর্টিফিকেশন ঐচ্ছিক, সেখানে বহুমুখী খাদ্যাভ্যাস থাকার পরেও মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩০৪০ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত অনুপুষ্টি পেয়ে থাকে। বিপরীতে, বাধ্যতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ৭০৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনে সাফল্য

সার্বজনীন লবণ আয়োডিনকরণ (USI) বাংলাদেশের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পুষ্টি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যা প্রমানকরে যে বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন কীভাবে একটি দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার উপর কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে।

১৯৮৯ সালে লবণে আয়োডিন সংযোজন কর্মসূচি চালু হলেও শুরুতে গুণগত মানের অনিশ্চয়তা ও মানুষের ক্রয়ের সদিচ্ছা ছিলো খুবই কম; যার ফলস্বরুপ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ২০ শতাংশেরও কম পরিবার যথাযথ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করত।

তবে সরকারের ধারাবাহিক অঙ্গীকার, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর জোরদার প্রয়োগ এবং লবণ প্রক্রিয়াজাতকারকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাজারে একটি বড় পরিবর্তন আসে। ২০১৯ সাল নাগাদ আনুমানিক ৬৫৭০ শতাংশ পরিবার যথাযথ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করত। এই বিস্তৃত সম্প্রসারণের ফলে গলগণ্ডসহ আয়োডিন ঘাটতিজনিত অন্যান্য রোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, এবং জাতীয় স্বাস্থ্য-অর্থনীতিতে আমরা এর সুফল ধারাবাহিকভাবে পাচ্ছি। আয়োডিনের অভাবে সৃষ্ট রোগ নির্মূলে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বাংলাদেশকে আয়োডিন পর্যাপ্ততার দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সার্বজনীন লবণ আয়োডিনকরণ (USI) অভিজ্ঞতা থেকে মূল শিক্ষা স্পষ্টযখন বাধ্যতামূলক নীতির সঙ্গে কার্যকর আইন প্রয়োগ, মান নিশ্চয়তা এবং শিল্পখাতের অংশগ্রহণ যুক্ত হয়, তখন ফর্টিফিকেশন দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায্য স্বাস্থ্যগত সুফল নিশ্চিত করতে পারে।

২০১৫ সালে চালু হওয়া ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ এর বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনেও একই ধরনের অগ্রগতির ধারা লক্ষ করা যায়। ভোজ্য তেল বাংলাদেশের জন্য ফর্টিফিকেশনের একটি আদর্শ বাহক, কারণ এটি সব স্তরের আয়ের  প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিবার নিয়মিত ব্যবহার করে।

ফর্টিফিকেশনের খরচ অত্যন্ত কমখাদ্যের ধরন ও যুক্ত অনুপুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর করে বছরে একজন মানুষের জন্য মাত্র ০.০৫ থেকে ০.২৫ ডলারের সমান ব্যয় হয় (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী), যা এটিকে সবচেয়ে সাশ্রয়ী পুষ্টি উদ্যোগগুলোর একটি করে তুলেছে।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, প্যাকেটজাত ও খোলাউভয় ধরনের ভোজ্য তেলে ফর্টিফিকেশনের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে, যার ফলে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পরিবারের কাছে ভিটামিন এ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। যদিও বাজারে খোলা তেলের মানসংক্রান্ত কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে, তবুও বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনের মাধ্যমে অর্জিত সামগ্রিক কাভারেজ যেকোনো ঐচ্ছিক ফর্টিফিকেশনের তুলনায় অনেক বেশি।

ভোজ্য তেল ফর্টিফিকেশনের ক্রমাগত সফলতা বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনের যথার্ততা প্রমান করে। জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ক্ষেত্রে পরিসর, ন্যায্যতা ও টেকসই পুষ্টিগত প্রভাব অর্জনে বাধ্যতামূলক পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর।

ফর্টিফিকেশনের ব্যয় বাস্তবতা: কিছু ভ্রান্তধারণা বনাম বাস্তব তথ্য

খাদ্য ফর্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে ব্যয়কে প্রায়ই একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়; তবে বাস্তবভিত্তিক প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে, ভোক্তাদের ওপর এর খরচের প্রভাব খুবই সামান্য, অথচ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সুফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধান খাদ্য সমূহে ফর্টিফিকেশনের খরচ : 

সূচক

মান

খুচরা মূল্যে প্রভাব

০.৫২%

বছরে খরচ (প্রতি মানুষ)

২৫৭০ টাকা

লাভখরচ অনুপাত

৮:১ ৩০:১


শিল্পখাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন কোনো আর্থিক বোঝা নয়; বরং এটি বাজারকে স্থিতিশীল রাখার একটি কার্যকর উপায়। এটি নিশ্চিত করে যে সব উৎপাদককে নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন বা মান অনুসারে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, ফলস্বরূপ, ফর্টিফিকেশনজনিত খরচ সবার জন্যই সমান হবে।

ফলে ফর্টিফিকেশন না করা বা নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারীদের মাধ্যমে সৃষ্ট অন্যায্য প্রতিযোগিতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও মান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে, যা রপ্তানি বাজারে প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রধান খাদ্যে ফর্টিফিকেশনের খরচ:

প্রধান খাদ্য

ফর্টিফাইড পুষ্টি উপাদান

আনুমানিক ফর্টিফিকেশন খরচ

খুচরা মূল্যে যোগ হওয়া খরচ

ভোক্তার ওপর খরচের চাপ

লবণ

আয়োডিন (KIO / KI)

০. ৫০০. ৮০ টাকা প্রতি কেজি

~১ টাকা প্রতি কেজি

খুচরা মূল্যের <০.৫%

ভোজ্য তেল

ভিটামিন এ

১.২১.৫ টাকা প্রতি লিটার

~১১.৫ টাকা প্রতি লিটার

খুচরা মূল্যের <১%

চাল (ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল মিশ্রণ)

আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন এ, ফলিক এসিড, ভিটামিন B₁₂

২.৫৩.৫ টাকা প্রতি কেজি

~৩ টাকা প্রতি কেজি

খুচরা মূল্যের ~২৩%

আটা

আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন এ, ভিটামিন B, B, B, B, ভিটামিন B₁₂, ক্যালসিয়াম, ফলিক এসিড

০.৮১.২ টাকা প্রতি কেজি

~১ টাকা প্রতি কেজি

খুচরা মূল্যের ~১%

 

সারণিতে উপস্থাপিত খরচের হিসাব বড় পরিসরের উৎপাদন ধরে করা হয়েছে, যেখানে ভিটামিন প্রিমিক্স সংগ্রহ, কার্যকর ও সঠিক মিশ্রণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) ও জাতীয় ফর্টিফিকেশন মানদণ্ড অনুসরণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই হিসাবগুলো কেবল ফর্টিফিকেশনের অতিরিক্ত খরচ প্রতিফলিত করেযার মধ্যে রয়েছে প্রিমিক্স, মান নিশ্চয়তা এবং সামান্য কার্যক্রমগত সমন্বয়জনিত খরচ; এতে এককালীন মূলধনী বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত নয়। এই খরচ সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যে সমন্বয় হয়।

খুচরা মূল্যে প্রভাবের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়েছে যে ফর্টিফিকেশনের খরচ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভোক্তাদের ওপর প্রতিফলিত হতে পারেযা বাংলাদেশের লবণ ও ভোজ্য তেলের বাজারে দেখা বাস্তব আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, উপাত্তগুলো একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তকে আরও জোরালো করেখাদ্য ফর্টিফিকেশন বিদ্যমান জনস্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত পদ্ধতিগুলোর একটি। বাধ্যতামূলকভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়িত হলে এটি ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান, দায়িত্বশীল শিল্পখাতকে সহায়তা এবং পরিবারগুলোর জন্য নগণ্য খরচে জনসংখ্যা-ব্যাপী পুষ্টিগত সুফল নিশ্চিত করে।

আটা ফর্টিফিকেশন: কেন আমরা এই সুযোগ হারাতে পারি না

আটা ফর্টিফিকেশন বাংলাদেশের পুষ্টি এজেন্ডায় গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুপুষ্টি সমস্যা সমাধানের একটি সুবর্ণ সুযোগ। মাথাপিছু গমের ব্যবহার বছরে আনুমানিক ৩৫৪০ কেজি হিসেবে অনুমান করা হয় এবং শহরাঞ্চলে পাউরুটি, নুডলস, বিস্কুট, রুটি ও পরোটার মতো আটা / ময়দাভিত্তিক খাদ্যের ওপর দ্রুত বাড়তে থাকা নির্ভরতার ফলে আটা / ময়দা ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে। শহরাঞ্চলে আটা / ময়দার সরবরাহ মূলত শিল্পভিত্তিক মিলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যা বৃহৎ পরিসরে ফর্টিফিকেশন বাস্তবায়নের জন্য কাঠামোগতভাবে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

তবে ফর্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে এখনো প্রধানত ঐচ্ছিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার ফলে পুষ্টি উপাদান সরবরাহে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হচ্ছে না এবং বিশেষ করে আয়রন ও ফলিক এসিডের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব সীমিত থেকে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব দেশ আটা ফর্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করেছে, সেখানে রক্তস্বল্পতা ১০৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং নিউরাল টিউব ডিফেক্টের মতো জন্মগত ত্রুটি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বাধ্যতামূলক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ একটি পরীক্ষিত ও স্বল্পব্যয়ী উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দ্রুত নগরায়ণশীল জনগোষ্ঠীর জন্য উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারত। পরীক্ষামূলকভাবে প্রভাব মূল্যায়নের জন্য সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরবরাহকৃত সম্পূর্ণ আটা, ফর্টিফাইড আটা হিসেবে বিতরণের উদ্যোগ নিতে পারে।

বাধ্যতামূলক বনাম ঐচ্ছিক ফর্টিফিকেশন: প্রমাণ কী বলে

সূচক

ঐচ্ছিক

বাধ্যতামূলক

জনসংখ্যা কাভারেজ

কম

বেশি

ন্যায্যতা

দুর্বল

শক্ত

পুষ্টি উপাদানের স্থায়িত্ব

অনিয়মিত

মানসম্মত

জনস্বাস্থ্য প্রভাব

সীমিত

প্রমাণিত

স্থায়িত্ব

দুর্বল

টেকসই

 

বাংলাদেশের জন্য কোনটি সবচেয়ে কার্যকর?

প্রমাণ স্পষ্ট ঐচ্ছিক ফর্টিফিকেশন উদ্ভাবন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং শিল্পখাতে প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এককভাবে এটি জাতীয় পর্যায়ে অর্থবহ পুষ্টিগত ফলাফল অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, সেখানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত প্রধান খাদ্যবিশেষ করে ভোজ্য তেল, আটা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণকৃত চালএ বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশন দেশব্যাপী কাভারেজ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।

এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ও প্রয়োগ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে মান ও নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কারিগরি সহায়তা প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা কম খরচে ফর্টিফিকেশন বাস্তবায়ন করতে পারে। টেকনোসার্ভ পরিচালিত মিলার্স ফর নিউট্রিশন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে সারাদেশে ফর্টিফিকেশনের সঙ্গে যুক্ত মিলারদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। পাশাপাশি, মিলার্স ফর নিউট্রিশন নির্দিষ্ট, প্রিমিয়াম ও মূল্য সংযোজিত পণ্যের ক্ষেত্রে ঐচ্ছিক ফর্টিফিকেশন উৎসাহিত করছে যা বাধ্যতামূলক কর্মসূচির পরিপূরক হিসেবে প্রসেসড ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে ফর্টিফাইড কাঁচামাল (যেমন ফর্টিফাইড আটা/ময়দা) ব্যবহার এবং খাদ্য শিল্পে ধারাবাহিক উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেবে।


উপসংহার: ফর্টিফিকেশন খরচ নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

সব প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়ফর্টিফিকেশন কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; এটি একটি দূরদর্শী বিনিয়োগ। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ, সেখানে ভোজ্য তেল, আটা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিতরণকৃত খাদ্যে বাধ্যতামূলক ফর্টিফিকেশনই সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ। ঐচ্ছিক উদ্যোগ উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে, তবে জাতীয় পর্যায়ে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক নীতির কোনো বিকল্প নেই।


লেখক পরিচিতি:

মোঃ নাঈম জোবায়ের বর্তমানে বাংলাদেশে TechnoServe-এ সিনিয়র ফুড ফর্টিফিকেশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি দীর্ঘ এক দশক ধরে দেশের ফর্টিফিকেশন সেক্টরে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, এবং বাংলাদেশ সরকার, মিলার, স্টেকহোল্ডার ও বিভিন্ন ফর্টিফিকেশন প্রোগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে Millers for Nutrition Initiative-কে প্রতিনিধিত্ব করেন। Millers for Nutrition- একটি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের জোট, যেখানে স্ট্র্যাটেজিক ফোর্টিফিকেশন পার্টনার্স হিসাবে BASF, BioAnalyt, DSM-Firmenich, Mühlenchemie, SternVitamin, আঞ্চলিক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার্স হিসাবে Hexagon Nutrition, Piramal, Sanku সংযুক্ত আছে। স্থানীয় পর্যায়ে, মিলারদের বড় একটি অংশ, যারা সক্রিয়ভাবে ফর্টিফিকেশন বাস্তবায়ন করছেন বা করতে যাচ্ছেন, তারাও এই জোটের গর্বিত অংশীদার। Millers for Nutrition পরিচালনা করছে TechnoServe, আর অর্থায়ন করছে Gates Foundation। মিলার, ফর্টিফিকেশন স্টেকহোল্ডার এবং জোটে যোগ দিতে আগ্রহীরা millersfornutrition.com-এ আরও তথ্য জানতে পারেন।

আরকে/প্রবা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা