রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের চিত্র
তানভীর হাসান ও কবির হোসেন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪১ এএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৫৫ এএম
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত
প্রসূতি মায়েদের জন্য সিজার একটি জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি। অথচ এই জরুরি পদ্ধতিটিই অহরহ ব্যবহৃত হচ্ছে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে। গত ৩৪ মাসে হাসপাতালটিতে একটি শিশুও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্ম নেয়নি। এমনকি হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া প্রসূতিদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্মদানে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও নেই। হাসপাতালটিতে বছরের পর বছর মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের হার শূন্যের কোঠায়। তবে একই সময় অন্য দুটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রসূতিদের অর্ধেকের কাছাকাছি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
হাসপাতালটিতে সেবা নেওয়া ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সিজারের জন্য নারী পুলিশ সদস্য ও তাদের সন্তানদের একটা সময় পর্যন্ত নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগতে হচ্ছে। এতে যেমন অনেক নারী সদস্য কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়ও।’ এমনকি হাসপাতালটির সেবার মান নিয়েও অসন্তোষ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটিতে লেবার ওয়ার্ড স্থাপনের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের বাধা দূর করার দাবি সাধারণ পুলিশ সদস্যদের।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সিজারিয়ান ছাড়াও স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে যা যা প্রয়োজন তার সব ব্যবস্থাই হাসপাতালটিতে রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতাল মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনের পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থাও রয়েছে। যারা এ সেবা নিতে চান তাদেরকে সেবা প্রদানে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। ব্যবস্থা রয়েছে।’
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। রাজারবাগহ পুলিশ হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৩৪ মাসে ১ হাজার ৯৮১টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। এই সময়ে হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক প্রসবে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করেনি। ফলে গত ২ বছর ১০ মাসে হাসপাতালটিতে মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের হার শূন্যের কোঠায়। অথচ একই সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে ৭ হাজার ১৮৬ শিশু। আর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে ৮ হাজার ৪২৩ শিশু। এ ছাড়া একই সময়ে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে ২ হাজার ৭৫৪টি এবং সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৫ হাজার ৮১৩টি। তা ছাড়া রাজধানীতে অবস্থিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারিয়ান প্রসবের পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে প্রতিদিনই।
পুলিশ হাসপাতালের এমন চিত্র নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সিজারে বাচ্চা জন্মদানের পর এক পর্যায়ে ভারী কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় ডিউটি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে। ফলে কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে।’ অপর এক নারী কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি আমাকে পার্বত্য এলাকায় বদলি করা হয়েছে। সেখানে গিয়ে পাহাড়ে ওঠার সময় শারীরিক অক্ষমতার বিষয়টি বুঝতে পারি।’ হাসপাতালের এই সমস্যার বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও কেউ কর্ণপাত করছেন না অভিযোগ করে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সিজারিয়ান অপারেশনের ধকল সইতে না পারা অনেক নারী সদস্যকেই বাধ্য হয়ে ডেস্কের কাজে বসাতে হচ্ছে। ফলে নারী ফোর্স সংকট বাড়ছে।’
সিজারিয়ান অপারেশনের সুফল-কুফল সম্পর্কে মোহাম্মদপুরের মা ও শিশু হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের প্রধান ডা. হাসমত আরা বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রসবের সুবিধা তো অনেক। মা প্রসবের দুদিন পরই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন, যা সিজারিয়ান প্রসবের ক্ষেত্রে কখনও সম্ভব না। স্বাভাবিক প্রসব হলে মাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগে না। কিন্তু সিজারিয়ান হলে মায়ের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণে রেখেই করতে হয়।’
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সেসব নারীর সাধারণ প্রসবের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকে সেসব ক্ষেত্রে মা এবং শিশুর নিরাপত্তা বিবেচনা করে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। কিন্তু আমরা দেখছি দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের হার বাড়ছে। এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর একটি বেশি বয়সে বাচ্চা নেওয়া। ৩০ বছরের পরে সিজার অপারেশন হার অনেক বেড়ে যায়। কারণ বাচ্চা নেওয়ার উপযুক্ত সময় ১৯ থেকে ২৯ বছর। আবার অনেক নারী নিজেরাই সিজার করার প্রস্তাব দেন। আরেকটি বিষয় হলো কোনো কোনো হাসপাতাল কিংবা ডাক্তাররা ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্যও দ্রুত সিজার করেন। সিজার করলে অর্থ উপার্জন ভালো হয় সেজন্যও করেন।’
স্বাভাবিক প্রসব সম্পর্কে মানুষদের ভালোভাবে বোঝানোর মাধ্যমে সিজার অপারেশনের হার কমানো সম্ভব বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এজন্য তিনি সরকার এবং জনগণ উভয় পক্ষের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।