কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৬ এএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:২৬ পিএম
যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদ মা-বাবার বারবার নিষেধ সত্ত্বেও টিফিনে লুকিয়ে খেয়ে নেয় কয়েকটা পুরি। কিন্তু পেটব্যথায় রাতভর কাঁদে সে। ডাক্তারের ভাষ্য, অতিরিক্ত পোড়া তেল ও নোংরা খাবারে তার মল শক্ত হয়ে গেছে, হজমের সমস্যা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, একই তেল একাধিকবার ভাজা হলে তেলের রাসায়নিক
গঠন ভেঙে যায়, তৈরি হয় টক্সিক বা বিষাক্ত যৌগ। এসব তেল থেকে শরীরে জমে ট্রান্সফ্যাট,
যা রক্তে চর্বির মাত্রা বাড়িয়ে হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করে। ছাত্ররা
নিয়মিত ভাজাপোড়া খেলে মনোযোগ ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হারায়।
২০২৫ সালে ইএনএন অনলাইনে প্রকাশিত ‘ভালো খাব ভালো থাকব’ শীর্ষক গবেষণায়
দেখা যায়, রাস্তার দোকানে বিক্রি হওয়া সস্তা ও সহজলভ্য খাবারগুলো শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে
বেশি আকৃষ্ট করে। ‘ভাজা পুরি’ এদের মধ্যে প্রথম সারিতে। এর পরেই রয়েছে সিঙ্গারা, পেঁয়াজু,
চপ ও ঝালমুড়ি। শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ জানায়, তারা নিয়মিত ভাজা খাবার খায়। তাদের ৬২
শতাংশ জানে না, এসব খাবারে অতিরিক্ত তেল, লবণ ও ক্যালরি বিদ্যমান। গবেষক দল শহর-উপশহরের
কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ ও পর্যবেক্ষণ চালায়। এতে উঠে আসে, অতিরিক্ত তেলে ভাজা নিয়মিত
খাওয়ার ফলে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি, গ্যাস্ট্রিক, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের
ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সেই প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুড-নির্ভর
হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)
এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ভাজা তেলের মান যাচাইয়ে ‘মোট পোলার যৌগ’ (টিপিসি) নির্ধারণে
একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দিয়েছে। তেল বারবার গরম হলে এর রাসায়নিক গঠন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত
হয়ে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। গবেষণা অনুযায়ী, নতুন তেলে টিপিসির মাত্রা থাকে ৫ থেকে
৭ শতাংশ। পাঁচবার বা তার বেশি ভাজার পর টিপিসি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছে যায়। এই মাত্রা
অতিক্রম করলে তেল আর নিরাপদ থাকে না।
২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী, শিশুদের জন্য বিপজ্জনক খাদ্য
বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ খুবই দুর্বল।
রাজধানীর কুড়াতলি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী রাকিবুল জানায়, টিফিন টাইমে
ভাজাপোড়া না থাকলে মনে হয় কিছুই খাইনি। অন্য কিছু খেতে মন চায় না। হাসিবুরের অভিভাবক
জানান, তার সন্তান ভাজাপোড়া দেখলেই কান্নাকাটি শুরু করে। ওর মুখের হাসি দেখে বাধা দিতে
পারি না। যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার ছাত্র রফিক আল হাবিব বলে, বিকালে ক্লাস শেষে
ভাজাপোড়া না খেলে মন ভরে না।
আলাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি বলেন, আড়াইহাজারে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আমার
দোকানের সামনের পুরি বিক্রি হয়। তারা একই তেল দিনের পর দিন ব্যবহার করছে।
রাজধানীর বর্ণমালা কলেজছাত্রী নুসরাত বলেন, দুপুরের ক্ষুধা মেটাতে
ভাজাপোড়া খাই। স্বাদ মজার।
আসাদুজ্জামান একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। বলেন, মেসে থাকি।
অনেক সময় রান্না হয় না। পাশেই দোকান। খেলে পেটে পীড়া শুরু হয়। তাই অনেকটা কমিয়ে দিয়েছি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাগুরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী
পরিচালক সজল আহম্মেদ বলেন, শহরের জামরুলতলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল শিশুখাদ্য উদ্ধার করে
পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
আমেরিকা ওয়েলনেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা
প্রফেসর ডা. এম মুজিবুল হক বলেন, কোনো খাবারকে অতিরিক্ত ভাজা হলে তার পুষ্টিগুণ নষ্ট
হয়ে যায় এবং তেলে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়। মাংস অতিরিক্ত ভাজা বা বারবিকিউ করলেও
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা
প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোজাম্মেল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তেল বারবার গরম
করার ফলে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে একিলামাইড নামক রাসায়নিকও
তৈরি হয়, যা ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিচিত। ভাজা খাবারে থাকা ফ্রি র্যাডিকেল
শরীরের কোষ নষ্ট করে ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করে।