× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দুর্বল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা

ঝুঁকিতে সরকারি হাসপাতালগুলো

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৩৮ এএম

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৮ এএম

ঝুঁকিতে সরকারি হাসপাতালগুলো

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর অধিকাংশই আগুন লাগার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বারবার এসব হাসপাতালকে নোটিস দিয়ে সতর্ক করা হলেও তা সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না এসব জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। খোদ রাজধানীতে সরকারি অনেক বড় হাসপাতালেই দীর্ঘসময় কোনো অগ্নি মহড়া নেই, নেই পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। এমনকি এসব হাসপাতালে রোগীদের আপদকালীন জরুরি প্রস্থানের ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেই।

ফায়ার সার্ভিসের সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু রাজধানীতে আগুন লাগার ঝুঁকিতে আছে চারশর বেশি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্থাপনের বিষয়ে একাধিকবার নোটিস এবং করণীয় নির্দেশক স্মরণিকা দেওয়া হলেও তা মানছে না হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষ। 

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি হাসপাতাল, শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে অগ্নি নির্বাপণের যন্ত্র থাকলেও তা সচল কি না এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কর্তব্যরত একাধিক আনসার সদস্য। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে চারশর বেশি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার আছে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত দেড় বছরে এসব সরঞ্জামের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়নি। হাসপাতাল পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গত এক বছরে হাসপাতালে অগ্নি নির্বাপণের কোনো মহড়া অনুষ্ঠিত হয়নি। একই চিত্র ঢাকার প্রায় সকল সরকারি হাসপাতালে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ফ্লোরে অগ্নি নির্বাপণ সিলিন্ডার থাকলেও এগুলো পুরনো ও ধুলো পড়া এবং বহুদিনের অব্যবহৃত। হাসপাতালে একাধিক কর্মচারী এই প্রতিবেদককে বলেন, অগ্নি নির্বাপণের কোনো মহড়ার কথা তারা জানেন না। এসব নিয়ে কোনো কার্যক্রম তাদের চোখে পড়েনি। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২১ সালে ও ২০২৩ সালে পরপর দুবার আগুন লাগে। জানা গেছে, গত এক বছরে দুবার মহড়া দিয়েছে অগ্নি নির্বাপণ টিম। ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবন থেকে পুরাতন ভবনে অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র রয়েছে এবং প্রত্যেকটার মেয়াদ ৩ বছর। ঢাকা মেডিকেলে বছরে একবার ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দ্বারা সবাইকে নিয়ে একটি মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তবে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড হলে রোগীদের দ্রুত প্রস্থানের যথেষ্ট পরিসর নেই।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, হাসপাতালটি ১২০ বছর আগের পুরনো ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। পুরনো ভবনটিতে জরুরি নির্গমনের পর্যাপ্ত সিঁড়ি নেই স্বীকার করে বলেন, মন্ত্রণালয়ে ৪০০০ বেডের নতুন একটি ভবনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তার হাসপাতালে ৬৭টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে এবং চলতি অক্টোবর মাসে ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একটি যৌথ মহড়ার আয়োজন করে। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় কিছু অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, ফায়ার এক্সটিংগুইশার ও পানি দেওয়ার পাইপ রয়েছে। তবে সমগ্র হাসপাতালের প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে মনে হয়েছে। 

আগারগাঁওয়ের চক্ষু হাসপাতাল ঘুরে তেমন কোনো অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। দেয়ালে ঝুলানো দুয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের সিলিন্ডার ও পানি ছিটানোর পাইপ রয়েছে, তবে তা সামান্য। হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী সাম্প্রতিক কোনো অগ্নি মহড়া সম্পর্কে বলতে পারেননি। চেম্বারে বসা একজন চিকিৎসক জানালেন, আমরা আগুন লাগার ঝুঁকি বোধ করছি না।

রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের প্রবেশ পথে চোখে পড়ে বাম পাশের দেয়ালে আগুন নেভানোর পানি সরবরাহ যন্ত্র। প্রতিটি তলায় রয়েছে এমন কিছু পানি সরবরাহের পাইপ ও কয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার সিলিন্ডার। তবে এগুলো সচল কি না তারা নিজেও জানেন না। এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হলে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. ফজলুল হক এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। হাসপাতালে একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বশেষ করোনাকালীন অগ্নি মহড়া হয়েছে। 

রাজধানীর কোনো সরকারি হাসপাতালে আলাদা করে কোনো ফায়ার ইউনিটি নেই। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুলে কেনান জানান, মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারীরা এই বিষয়টি দেখভাল করেন। অর্থোপেডিক চিকিৎসায় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশেষায়িত এই হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেন, ১৩০টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার সিলিন্ডার রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এই হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে চলাচলে অক্ষম রোগীরা জীবন আশঙ্কায় পড়বেন। কারণ রোগীদের জন্য জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নেই। পরিচালক জানান, হাসপাতালের কোনো মাঠ না থাকায় অগ্নি মহড়া দেওয়া বেশ দুরূহ। 

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। হাসপাতালের ১২ তলা ভবনের ৫ তলার আইসিইউ কেবিনের বাইরে বৈদ্যুতিক কেবল থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। 

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শিশু হাসপাতালের কার্ডিয়াক আইসিইউতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিটের ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, এই শিশু হাসপাতালটিতে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না।

চলতি বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে বন্ধ থাকা সেন্ট্রাল সিটি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পরে তালা কেটে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে ফায়ার সার্ভিস। ১৯ অক্টোবর রাত ১২টায় এই আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে হঠাৎ আগুন দেখে স্থানীয় লোকজন এবং পথচারীরা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে তালা কেটে ভেতরে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। 

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ভবনের নিচতলার স্টোররুমে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। একই বছরের জুন মাসেও এই হাসপাতালেরই আরেকটি স্টোর রুমে আগুন লাগে। তখনও সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। 

সরকারি হাসপাতালগুলোর অগ্নিব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল তাজুল ইসলামকে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

হাসপাতালের আগুন নিরোধ সম্পর্কে ঢাকার স্টেশনের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, হাসপাতালের নকশা এবং নির্মাণে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করলে, যেমন ফায়ার-রেটেড দেয়াল, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম এবং জরুরি নির্গমন পথের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া হাসপাতালে আগুন লাগার ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং আগুন লাগলে রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি কার্যকর জরুরি পরিকল্পনা তৈরি ও সেটির নিয়মিত মহড়া দেওয়া হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সহনীয় থাকবে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে, স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্বল ও স্বল্প মহড়ার কথা স্বীকার করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আমরা প্রয়োজনীয় মহড়া দিতে পারছি না, এটা সত্য। তবে বিষয়টা স্পর্শকাতর এবং এসব বিষয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দ্রুত নির্দেশনা দেওয়া হবে।

অগ্নিঝুঁকি নিয়ে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের জালাল হোসেন নামের একজন রোগীর স্বজন জানান, কিছুটা ভয় তো আছেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের রহিমা বেগম নামের একজন রোগীর স্বজন জানান, এমনকিছু ঘটলে আমরা জীবন নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ে যাব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা