মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:১৩ পিএম
বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় অন্যান্য খাতের তুলনায় স্বাস্থ্য খাত বাজেটে বরাবরই কম গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি নীতিনির্ধারকদের অমনোযোগ ও উদাসীনতায় স্বাস্থ্য খাত বেসরকারিকরণের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সদিচ্ছা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিতরণে দক্ষতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ঝুঁকে পড়ার এটি একটি কারণ বলে মনে করা হয়।
জানা গেছে, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার ৭০ শতাংশের বেশি প্রদান করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ। বিপুল সংখ্যক অসচ্ছল নাগরিকের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের এই ভার একটি স্থায়ী বোঝা। ১২১টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মধ্যে বর্তমানে ইডিসিএল (সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান) মাত্র ৩১টি উৎপাদন করে। এর অর্থ অবশিষ্ট ৮১টি ওষুধ দরিদ্র জনগণকে অর্থ ব্যয় করে কিনতে হয়। এটা চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়ায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা; অর্থাৎ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত কয়েক বছরেরও বাজেটে বরাদ্দ ৫ শতাংশের আশপাশে ছিল।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে বলেছে, জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ এ খাতে থাকা উচিত। বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলে আসছেন। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে সহমত জানিয়ে বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্কার প্রস্তাবনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না, যদি না স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়।
২০১৯-২০ সালের বাজেটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। পুরো বাজেটের আকারের তুলনায় তা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ সালে বরাদ্দ ছিল জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ। উন্নত দেশের মধ্যে নিউজিল্যান্ডে ব্যয় করা হয় জিডিপির ৯ শতাংশ। জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপির বিচারে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারের বরাদ্দের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। মাথাপিছু মাত্র ১ হাজার ৫৩৭ টাকা। এ কারণে মানুষকে নিজের পকেট থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মতো খরচ করতে হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যের পেছনে ১০০ টাকা খরচ হলে সরকারি সহায়তা পাওয়া যায় ৩৪ টাকা এবং বাকি ৬৬ টাকা রোগী নিজে বহন করেন।
দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবস্থাপনায় আনা যায় কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা এখন ৩৫-৪০ শতাংশ সেবা দিই। বাকিটা দেয় বেসরকারি খাত। শতভাগ সেবা দিতে পারলে ভালো হতো। তবে এটা দ্রুত সম্ভব নয়।
সামরিক চিকিৎসা সার্ভিস মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএমএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী মো. রশীদ উন নবী বলেন, দেশের মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতে পারে, বাকিদের বেসরকারি হাসপাতালে নিতে হয়। ডব্লিউএইচও ফ্লোরে চিকিৎসা দেওয়াকে সমর্থন করে না। কিন্তু সক্ষমতা কম, তাই ফ্লোরেও চিকিৎসা দিতে হয়।
২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় শতভাগ সরকারি অর্থায়ন অর্থাৎ বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। এছাড়া সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ের চিকিৎসাসেবায় হাইব্রিড অর্থায়ন মডেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। তারা বলছেন, হাইব্রিড অর্থায়ন মডেল চালু হলে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি সেবায় সমতা, সক্ষমতা ও আর্থিক সুরক্ষা বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, বিশ্বের চারটি মডেল স্বাস্থ্যসেবা প্রচলিত- বেভারিজ মডেল, বিসমার্ক মডেল, জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা মডেল এবং আউট অব পকেট মডেল। এগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, অর্থায়ন এবং বিতরণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত প্রথম তিনটি মডেলের যেকোনো একটি অনুসরণ করা হয়, যেখানে রাষ্ট্র বা বীমা কাঠামো চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও ‘আউট অব পকেট’ মডেলের ওপর নির্ভরশীল, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ায় এবং জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
স্বাস্থ্য কমিশনের সুপারিশে বিসমার্ক মডেল ও জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা মডেলের সমন্বয়ে একটি ‘হাইব্রিড স্বাস্থ্যসেবা মডেল’ প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং সব শ্রেণির নাগরিককে সেবার আওতায় আনতে সক্ষম। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনের রূপরেখা। মডেলটি বাস্তবায়নে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা ফান্ড গঠন করা হবে; যার অর্থ আসবে সরকারি বরাদ্দ, কর্মচারী-নিয়োগকর্তার যৌথ অবদান এবং প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি অনুদান থেকে। এতে সরকারের ওপর একক চাপ সৃষ্টি না হয়ে একটি অংশীদারি ব্যবস্থা তৈরি হবে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে শতভাগ রাষ্ট্রীয় করা সম্ভব নয় কেন, এমন প্রশ্ন করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রাইমারি হেলথকেয়ার শতভাগ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হওয়া উচিত। বেসরকারি খাতকে রেগুলেটরি মেকানিজমের আওতায় আনতে হবে। আমাদের সমস্যা হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র নেই, তত্ত্ব-উপাত্তের ঘাটতি আছে এবং স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নেই। ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল। তারা সেটা পূরণ করতে পারেনি।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার আনার জন্য যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং জনগণকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। চলতি বছরের ৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দিলেও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।