× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিষে ভরা রাস্তার খাবার

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৭ এএম

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২৫ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েকদিন ধরে ডায়রিয়াজনিত রোগে কষ্ট পেয়ে চলেছেন রাজমিস্ত্রি শাফায়াত জামাল। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি কাজের ফাঁকে প্রায়ই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আখের রস কিনে খেতাম। কিন্তু গত রবিবার সেই রস খাওয়ার পর বাসায় ফিরে পেটে ভীষণ ব্যথা অনুভব করেছিলাম। রাত হতে না হতেই ডায়রিয়া শুরু হয়। সেই যন্ত্রণা এতটাই কঠিন ছিল যে আমি বুঝতে পারি, আর কখনও বাইরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার খাওয়ার সাহস আমার হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ মানুষ ফুটপাতের খাবার খায়। একজন অসচেতন বিক্রেতার মাধ্যমে শত শত মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

২০১৬ সালে এশিয়া জার্নাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল রিসার্চে ডিটেকশন অব ইন্টারিক ব্যাকটেরিয়া ইন দ্য পপুলার স্ট্রিট ফুড চটপটি ইন ঢাকা শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা পেপারে বলা হয়, ২০১২ সালে ঢাকা শহরের ১৮টি স্থানে ১০৮টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৭৮% খাবার দূষিত। প্রধান জীবাণু হলো অ্যাসিনেটোব্যাকটার (৬৬%), ক্লেবসিয়েলা প্রজাতি (৫৪%), ই-কলাই (৩%) ও প্রোটিয়াস প্রজাতি (০.৯%)। ৪৪% নমুনায় একাধিক ব্যাকটেরিয়া মিলেছে। দূষিত চটপটি দীর্ঘমেয়াদে ডায়রিয়া ও অন্যান্য অন্ত্রসংক্রান্ত রোগের কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, ফুটপাতের শতভাগ খাবারে আছে মলের জীবাণু কলিফর্ম ও ই-কোলাই। এই জীবাণুর মাত্রা মানবদেহের সহনীয় সীমার অনেক ওপরে। আখের রস, ভেলপুরি, পানিপুরি, ঝালমুড়ি, নুডলস ও জাম্বুরা মাখার মতো জনপ্রিয় খাবারে জীবাণুর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলকভাবে লেবুর রস ও তেঁতুল পানিতে জীবাণুর মাত্রা কিছুটা কম।

বিএআরসির সদস্য পরিচালক ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, স্ট্রিট ফুড সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে জনপ্রিয়, কিন্তু যেভাবে প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হয়, সেখানে হাইজিন নেই। খাবারের উপকরণও অনেক সময় অস্বাস্থ্যকর স্থান থেকে আনা হয়। তাই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।

পাবমেডে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন। এর মধ্যে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ও পেটের সংক্রমণ প্রধান। এসব অসুস্থতার উৎস প্রায়শই রাস্তার খাবারে থাকা ক্ষতিকর জীবাণু।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১০ সালে ফুড সেফটি চ্যালেঞ্জেস টাওয়ার্ডস সেফ, হেলদি অ্যান্ড নিউট্রিশিয়াস স্ট্রিট ফুডস ইন বাংলাদেশ শিরোনামে পাবমেড সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার রাস্তার খাবার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ২৫ শতাংশ মানুষ অশিক্ষিত, যাদের নেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। তারা দিনে ১৩ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন, টয়লেট বা বিশুদ্ধ পানির সুযোগ ছাড়া। দোকানগুলোর ৬৮ শতাংশ ফুটপাতে এবং ৩০ শতাংশ ড্রেনের পাশে, যেখানে বাতাস ও পানি দূষিত।

২০১২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিঙারা, ঝালমুড়ি, চটপটি, জিলাপি, আমড়া, আচার ও বিভিন্ন রস ও জুসে স্যালমোনেলা, ই-কোলাই, লিস্টেরিয়া ও স্ট্যাফিলোকক্কাস পাওয়া গেছে। এসব ব্যাকটেরিয়া সরাসরি ডায়রিয়া, বমি, খাদ্যবিষক্রিয়া ও অন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত প্রেভেলেন্স অব মাইক্রোবিয়াল হ্যাজার্ডস ইন স্ট্রিট ফুড অ্যান্ড রেডি টু ইট স্যালাড আইটেমস ইন রেস্টুরেন্টস অ্যান্ড দেয়ার প্রোবেবল রিস্ক অ্যানালাইসিস গবেষণা শিরোনামে উঠে এসেছে, রাজধানীর ৩৭টি জোন থেকে ৪৫০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি চটপটিতে গড়ে ৭ কোটি ২০ লাখ ই-কোলাই, ৭০০-এর বেশি সালমোনেলা ও ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ছোলামুড়িতে ৭ লাখ ৪০ হাজার ই-কোলাই ও ৩০ লাখ ভিব্রিও আছে। আখের রসেও রয়েছে ৬৫ হাজার ই-কোলাই ও ১৭ হাজার সালমোনেলা। গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে গড়ে ৭ জন রাস্তার খাবার খেয়ে জীবাণু আক্রান্ত হন।

রাস্তার খাবারের সঙ্গে যুক্ত কাঁচামালেও রয়েছে বিপজ্জনক উপাদান। কলা পাকাতে কিছু নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা কৃত্রিমভাবে ফলকে উজ্জ্বল করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও লিভারে ক্ষতি করতে পারে।

বিক্রেতাদের সচেতনতার অভাবও লক্ষণীয়। রাজধানীর ৫৫ শতাংশ রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রায় জীবাণু আছে। ৮৮ শতাংশ বিক্রেতার হাতেই থাকে বিভিন্ন জীবাণু। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অসচেতনতা ও বিশুদ্ধ পানির অভাবই মূল কারণ।

কিছু বিক্রেতা পরিষ্কার থাকার চেষ্টা করেন। ফার্মগেট মোড়ে ঝালমুড়ির দোকান চালান জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখি, কিন্তু পানি ও টয়লেটের অভাব আছে। কুড়িল চৌরাস্তায় আখের রস বিক্রেতা শেখ আজিজুর বলেন, পানি দিয়ে মেশিন ধুই, কিন্তু যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলা থেকে রক্ষা করা যায় না।

খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান বলেন, একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে সুস্থ জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসের মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যানসার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী অধ্যাপক মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, আতঙ্কিত না হয়ে সমন্বিত উদ্যোগ ও গবেষণার মাধ্যমে খাদ্যদূষণ প্রতিরোধ করতে হবে।

শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা হক বলেন, রাস্তার খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করলে জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি জরুরি।

ডা. মুশতাক হোসেন উল্লেখ করেন, রোগ ছড়িয়ে গেলে ব্যবস্থা কার্যকর হয় না, তাই প্রাথমিক প্রতিরোধ জরুরি। তিনি বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা