ডা. এম আর করিম রেজা
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৪৯ পিএম
মানবদেহে চুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়Ñবরং এটি আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। চুল পড়ে যাওয়া মানে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, অনেকের কাছে তা আত্মবিশ্বাসের ফাটল। নানা কারণে চুল পড়ে যায়। যার মধ্যে একটি হলো Alopecia AreataÑএকটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত চুলের ফলিকলকে আক্রমণ করে, ফলে চুল ঝরে যায়। দীর্ঘদিন ধরে নানা ইনজেকশন, স্থানীয় স্টেরয়েড বা ইমিউনোথেরাপি ব্যবহৃত হলেও এটির চিকিৎসায় ফলাফল ছিল সীমিত। কিন্তু সাম্প্রতিক এই জগতে উদিত হয়েছে এক নতুন নামÑবারিসিটিনিব (Baricitinib)Ñএকটি অণু, যা বিজ্ঞানের অন্ধকার পথে আলোর রেখা হয়ে এসেছে।
বিজ্ঞানের আলোয় বারিসিটিনিব
বারিসিটিনিব একটি Janus Kinase (JAK) inhibitorÑযা JAK-STAT pathway-এর কার্যক্রম প্রতিরোধ করে। এই পথটি ইমিউন কোষের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন বারিসিটিনিব JAK1 ও JAK2 এনজাইমকে বাধা দেয়, তখন Interferon-gamma ও Interleukin-15 এর অতিসক্রিয়তা কমে যায়। ফলস্বরূপ, চুলের ফলিকলগুলো তাদের স্বাভাবিক চক্রে ফিরে এসে পুনরায় বৃদ্ধি শুরু করে।
গবেষণার ফলাফল
২০২২ সালে New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত BRAVE-AA1 ও BRAVE-AA2 ট্রায়ালে দেখা যায়, প্রতিদিন ৪ মিলিগ্রাম বারিসিটিনিব গ্রহণকারী রোগীদের প্রায় ৩৫–৪০% এর মাথার চুল ৩৬ সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে ফিরে আসে। সেই তুলনায়, প্লাসেবো গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ৫–৬%। এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের FDA (Food and Drug Administration) Alopecia Areata–এর চিকিৎসার জন্য বারিসিটিনিবকে অনুমোদন দেয়Ñযা এই রোগের প্রথম অনুমোদিত মুখে খাওয়ার ওষুধ।
কিশোরদের মধ্যেও সাফল্য
গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত Eli Lilly-এর সর্বশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ২৫৭ জন কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়, যাদের ছিল গুরুতর Alopecia Areata বা প্যাচি টাকের সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ মিলিগ্রাম বারিসিটিনিব গ্রহণে এক বছরের চিকিৎসার পর ৫০%–এরও বেশি কিশোর রোগীর চুল পুনরায় গজিয়েছে।
কার্যকারিতা
বারিসিটিনিবের প্রভাব ধীর, কিন্তু স্থায়ী। নিয়মিত ব্যবহারে ৩-৬ মাসের মধ্যে ফলাফল দৃশ্যমান হয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এটি শুধু মাথার চুল নয়, ভ্রু, দাড়ি ও শরীরের অন্যান্য অংশের চুল পুনরুদ্ধারেও বেশ কার্যকর।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ইমিউন সিস্টেমে প্রভাব ফেলায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমনÑহালকা সংক্রমণ (সর্দি, গলা ব্যথা ইত্যাদি)। লিভার এনজাইম বা কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি। খুব বিরল ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধা বা হৃদরোগের ঝুঁকি। তবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত রক্তপরীক্ষা করলে এসব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ভবিষ্যতের দিগন্ত
বর্তমানে Alopecia Areata–এর চিকিৎসায় বারিসিটিনিব ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এর কার্যকারিতা আন্দ্রোজেনিক টাক (Androgenic Alopecia)-এর ক্ষেত্রেও অনুসন্ধান করছেন। গবেষণা চলছেÑ কীভাবে এই ওষুধ চুলের ফলিকল পুনর্জীবনে সহায়তা করে।
পুনর্জন্মের প্রতিশ্রুতি
চুল পড়া এক মানসিক আঘাত, আর চুল ফিরে পাওয়া যেন এক নবজন্মের অনুভূতি। বারিসিটিনিব সেই নবজন্মের প্রতিশ্রুতি বহন করছেÑএকটি ছোট ট্যাবলেট, যা কেবল চুল নয়, আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনছে।
লেখক: ত্বক, সৌন্দর্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ